সংবাদ কলকাতা:— ক্ষমতায় আসার ১০৬ দিনের মাথায় সরকারের উন্নয়ন ও সুশাসনের কাজের খতিয়ান তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে অন্নপূর্ণা যোজনার একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি রাজ্যের বিভিন্ন প্রকল্পের পাশাপাশি অন্নপূর্ণা যোজনার অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দেন। একই সঙ্গে বিরোধীদের সমালোচনা, সমাজমাধ্যমের প্রচার এবং সংবাদমাধ্যমের একাংশের ভূমিকা নিয়েও সরব হন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, অন্নপূর্ণা যোজনায় ইতিমধ্যেই রাজ্যের ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে গিয়েছে। প্রকল্পের সুবিধাভোগীর সংখ্যা আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে বলেও তিনি জানান। তাঁর কথায়, প্রকৃত যোগ্য আরও ২০ থেকে ৩০ লক্ষ মহিলা থাকলে তাঁদেরও প্রকল্পের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে।
অন্নপূর্ণা যোজনার অগ্রগতির হিসাব তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, জুন মাসে প্রথম পর্যায়ে ২৮ লক্ষ মহিলার নাম অনুমোদিত হয়েছিল। জুলাইয়ে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১৯ লক্ষ। অগস্টে তা আরও বেড়ে ১ কোটি ৪৫ লক্ষে পৌঁছেছে।

ভবানীপুর বিধানসভা এলাকার প্রসঙ্গেও নির্দিষ্ট তথ্য দেন তিনি। তাঁর দাবি, ওই এলাকায় প্রায় ১৭ হাজার যোগ্য মহিলার অ্যাকাউন্টে একসঙ্গে তিন হাজার টাকা করে পৌঁছে গিয়েছে। প্রযুক্তিগত কারণে যাঁরা অনলাইনে নাম নথিভুক্ত করতে পারেননি, তাঁদেরও প্রকল্পের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, যোগ্য কোনও মহিলাকে প্রকল্পের সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া হবে না। আবেদন ও নথিভুক্তির ক্ষেত্রে যাঁদের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের সহযোগিতা করার জন্য দলের কর্মী ও মহিলা সংগঠনের প্রতিনিধিদের কাজে লাগানো হবে বলেও তিনি জানান।
অন্নপূর্ণা প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে আগের সরকারের আমলে রাজনৈতিক বৈষম্য হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বিজেপি সমর্থক এবং বিজেপি প্রভাবিত এলাকার বহু মহিলা আগের সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। নতুন সরকার তাঁদের অগ্রাধিকার দেবে বলে জানান তিনি।
পূর্বতন সরকারের প্রশাসনিক কাজ নিয়েও এ দিন আক্রমণাত্মক ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সিঙ্গুরে শিল্পের পরিস্থিতি, নিয়োগ দুর্নীতি এবং বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ সংস্থার কাজ নিয়ে তিনি একাধিক অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যে প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল এবং এর ফলে সাধারণ মানুষ ও চাকরিপ্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সরকারের মাত্র ১০৬ দিনের কাজ নিয়ে বলতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে রাজ্যে জাতীয়তাবাদ, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের নতুন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সমাজমাধ্যমে রিল তৈরি করে বা কয়েক জনকে নিয়ে আন্দোলন করলেও সরকারকে সিদ্ধান্ত থেকে সরানো যাবে না বলে স্পষ্ট বার্তা দেন তিনি।

আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর অন্নপূর্ণা দিবস পালনের কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিন উপলক্ষে ওই দিন রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় অন্নপূর্ণা যোজনার উপভোক্তাদের নিয়ে কর্মসূচি হবে। কলকাতায় এক লক্ষ অন্নপূর্ণা যোজনার উপভোক্তাকে নিয়ে একটি বড় সভা করার কথাও জানান তিনি।
রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বিজেপি ২ কোটি ৯২ লক্ষ মানুষের সমর্থন নিয়ে ২০৮টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। আগামী দিনে বিভিন্ন উপনির্বাচনেও বিজেপির প্রতি মানুষের সমর্থন বজায় থাকবে বলে দাবি করেন তিনি।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কয়েক জনকে রাস্তায় নামিয়ে, সমাজমাধ্যমে প্রচার চালিয়ে এবং সংবাদমাধ্যমে আলোচনা তৈরি করে তাঁকে চাপের মুখে ফেলা যাবে না। তাঁর দাবি, তৃণমূল এখন সাংগঠনিক ভাবে দুর্বল এবং দলের অভ্যন্তরে বিভাজন তৈরি হয়েছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রসঙ্গও ওঠে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। জাতীয়তাবাদ ও ‘বন্দে মাতরম্’ নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করলে ‘বন্দে মাতরম্’ গাইতে হবে। এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ভবানীপুরের কর্মসূচি থেকে অন্নপূর্ণা যোজনার সাফল্যের পরিসংখ্যান তুলে ধরার পাশাপাশি আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচিরও ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এক দিকে যোগ্য মহিলাদের প্রকল্পের আওতায় আনার আশ্বাস, অন্য দিকে বিরোধীদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ—দুই বার্তাই এ দিনের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে।
