হাওড়ার আন্দুলের বাসিন্দা পবন যাদব চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়া ছিল। রবিবার সকালে পেটে ব্যথা শুরু হওয়ায় তাকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের শিশু বিভাগে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যেরা। সকাল ১০টা নাগাদ তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। পরিবারের দাবি, হাসপাতালে আনার সময় পবন নিজেই হেঁটে ভিতরে ঢুকেছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। চিকিৎসা চলাকালীন একের পর এক ইঞ্জেকশন দেওয়ার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।
পবনের পরিবারের অভিযোগ, দ্বিতীয় ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরেই শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। কী ওষুধ দেওয়া হয়েছিল এবং কেন সামান্য পেটের ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে আসা শিশুটির মৃত্যু হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। পরিবারের আরও অভিযোগ, চিকিৎসার সময় কোনও সিনিয়র চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। জুনিয়র চিকিৎসকেরাই পবনের চিকিৎসা করছিলেন বলে দাবি করেছেন মৃতের পরিজনেরা। তাঁদের বক্তব্য, চিকিৎসায় কোনও গাফিলতি হয়ে থাকলে তার দায় নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিশুমৃত্যুর ঘটনায় ভুল ইঞ্জেকশন দেওয়ার অভিযোগ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরেও এসেছে। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ইন্দ্রনীল বিশ্বাস জানিয়েছেন, পেটে ব্যথার উপসর্গ নিয়ে শিশুটিকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। ব্যথা কমানোর জন্য তাকে ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। পরে আচমকাই তার হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকেরা দ্রুত তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন এবং বুকে চাপ দিয়ে হৃদ্যন্ত্র চালু করার প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
অধ্যক্ষ জানিয়েছেন, মৃতের পরিবারের তরফে ভুল ইঞ্জেকশন দেওয়ার অভিযোগ জানানো হয়েছে। সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তবে ঠিক কোন কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে চিকিৎসার নথি, দেওয়া ওষুধ এবং ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসার সময় সিনিয়র চিকিৎসক কেন উপস্থিত ছিলেন না, তারও উত্তর দিতে হবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। রবিবার ও সরকারি ছুটির দিনে সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক রাখার বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি স্বাস্থ্য ভবনে বৈঠক হয়েছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ও ছুটির দিনে হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিলেন। তার পরেও কলকাতা মেডিক্যালে এমন অভিযোগ ওঠায় সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা ও নজরদারি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ঘটনার সময় পবনের বাবা নরেশ যাদব আন্দুলের বাড়িতে ছিলেন। সকালে ছেলের পেটের ব্যথার খবর পাওয়ার পর তিনিই স্ত্রীকে তাকে কলকাতা মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পরে সন্তানের মৃত্যুর খবর পেয়ে ভেঙে পড়েন তিনি। নরেশের অভিযোগ, হাসপাতালে কোনও সিনিয়র চিকিৎসক ছিলেন না। জুনিয়র চিকিৎসকদের চিকিৎসার সময় ভুল ইঞ্জেকশন দেওয়ার কারণেই ছেলের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। তবে এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
ঘটনার খবর পেয়ে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জোড়াসাঁকোর বিধায়ক বিজয় ওঝা। তাঁরা মৃত শিশুর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁদের বক্তব্য শোনেন। কী পরিস্থিতিতে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে আশ্বাস দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ঘটনার তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠনের কথাও জানান তিনি।
প্রথমে পবনের দেহের ময়নাতদন্ত করাতে রাজি ছিলেন না তার বাবা-মা। সন্তানের দেহে আর কাটাছেঁড়া হোক, তা তাঁরা চাননি। শোকাহত পরিবারের এই আপত্তির পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তাঁর অনুরোধে ময়নাতদন্তে সম্মতি দেন পবনের বাবা-মা। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, চিকিৎসায় কোনও গাফিলতি হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে তার কারণ কী। ভুল ইঞ্জেকশন দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি সিনিয়র চিকিৎসকের উপস্থিতি, চিকিৎসার পদ্ধতি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নেওয়া পদক্ষেপও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তদন্তের রিপোর্ট ও ময়নাতদন্তের ফল প্রকাশ্যে এলে পবনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
