‘মিথ্যাচার-দ্বিচারিতা দিয়ে সত্য বদলানো যায় না’
নিউ ইয়র্ক: রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভার ৮১তম অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ভারতবিরোধী বক্তব্যের জবাব দিল নয়াদিল্লি। ‘রাইট টু রিপ্লাই’ প্রয়োগ করে ভারতের রাষ্ট্রসঙ্ঘে স্থায়ী মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি পেটাল গহলৌত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদে মদত, দ্বিচারিতা ও মিথ্যাচারের অভিযোগ তোলেন। জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের দাবিও খারিজ করে ভারত স্পষ্ট জানিয়েছে, কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শাহবাজ শরিফ তাঁর ভাষণে কাশ্মীর, ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলেছিলেন। পাকিস্তানের সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, তিনি ২০২৫ সালের সংঘাতের প্রসঙ্গও তোলেন এবং দাবি করেন, পাকিস্তান আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেছিল। পাশাপাশি সিন্ধু নদের জল নিয়ে ভারতের যে কোনও পদক্ষেপকে পাকিস্তান গুরুতরভাবে দেখবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন।

এর জবাবে পেটাল গহলৌত বলেন, পাকিস্তানের বক্তব্যে যে ‘বয়ান’ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই। ভারতের প্রতিনিধি বলেন, বছরের পর বছর কোনও বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করলেই তা সত্যে পরিণত হয় না। তাঁর অভিযোগ, সন্ত্রাসবাদ, প্রতারণা ও দ্বিচারিতার মাধ্যমে পাকিস্তান নিজের কোনও সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।
সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে আরও কড়া বার্তা দিয়েছে ভারত। গহলৌত বলেন, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করে আসছে এবং সেটিই দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম বড় সমস্যার জায়গা। ভারতের বক্তব্য, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করা হবে এবং পাকিস্তানের মাটি থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের পরিণতি ইসলামাবাদকে বহন করতে হবে।
সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থানকে প্রশ্ন করতে গিয়ে গহলৌত ওসামা বিন লাদেনের প্রসঙ্গও টানেন। অ্যাবোটাবাদে পাকিস্তানি সামরিক অ্যাকাডেমির কাছেই লাদেন দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে ছিলেন—এই তথ্য উল্লেখ করে ভারতের প্রতিনিধি পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদবিরোধী অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

শুধু সন্ত্রাসবাদ নয়, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের অধিকার ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিস্থিতি নিয়েও পাল্টা প্রশ্ন তোলে ভারত। শাহবাজ শরিফ তাঁর ভাষণে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তার জবাবে ভারতীয় প্রতিনিধি পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, সেখানে প্রকৃত ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, তা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে অজানা নয়।
কাশ্মীর প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থানও ফের স্পষ্ট করা হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রসঙ্ঘে জম্মু ও কাশ্মীরকে আন্তর্জাতিক বিতর্কের বিষয় হিসেবে তুলে ধরলেও ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। নয়াদিল্লির অবস্থান, জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এই বিষয়ে পাকিস্তানের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের মঞ্চে দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের আবহে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত ফের আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। পাকিস্তান যেখানে কাশ্মীর, ২০২৫ সালের সামরিক সংঘাত এবং জলবণ্টনকে সামনে রেখে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, ভারত সেখানে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদকেই দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার অন্যতম মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

এর আগে রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধিবেশন ঘিরে পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন। একই সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের ঘটনাও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
ফলে ৮১তম সাধারণ সভার মঞ্চে ভারত-পাকিস্তান কূটনৈতিক সংঘাতের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কাশ্মীর, সন্ত্রাসবাদ, জলবণ্টন এবং দুই দেশের পারস্পরিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। ভারতের বক্তব্য, পাকিস্তানকে প্রথমে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে; আর পাকিস্তান নিজেদের বক্তব্যে কাশ্মীর ও জলবণ্টনকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরছে।
