September 13, 2026
রাজ্য

ঔপনিবেশিক ব্যাখ্যার গণ্ডি থেকে ভারতীয় জ্ঞানচর্চাকে মুক্ত করার ডাক অমিত শাহের

মুম্বাই— ভারতীয় জ্ঞান, ইতিহাস ও বৌদ্ধিক পরম্পরাকে কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শ বা ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির গণ্ডিতে আটকে রাখা উচিত নয় বলে মন্তব্য করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মুম্বাইয়ের এশিয়াটিক সোসাইটিতে ‘গণেশ জ্ঞানার্থী’ প্রদর্শনীর উদ্বোধনে গিয়ে তিনি বলেন, জ্ঞানকে কোনও বিশেষ মতাদর্শের মধ্যে বেঁধে দিলে তার প্রকৃত অর্থই বদলে যায়।

অমিত শাহের বক্তব্য, ভারতীয় জ্ঞানচর্চাকে ভারতের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নতুন করে দেখা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব ভারতীয় ইতিহাস ও জ্ঞানপরম্পরার ব্যাখ্যায় ছিল বলে দাবি করে তিনি বলেন, এই ধরনের ব্যাখ্যা সমাজের মধ্যে নিজেদের ঐতিহ্য সম্পর্কে হীনমন্যতা তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘প্রকৃত জ্ঞান কখনও কোনও মতাদর্শের হাতে বন্দি থাকে না। জ্ঞান নিজেই একটি মতাদর্শ। তাকে কোনও ভাবে বেঁধে দিলে জ্ঞানের অর্থই বদলে যায়। জ্ঞান মুক্ত ও বাধাহীন হওয়া উচিত এবং তার প্রকাশও মুক্ত ও বাধাহীন হওয়া উচিত।


ভারতের কণ্ঠে ভারতীয় জ্ঞানচর্চার প্রয়োজন

এশিয়াটিক সোসাইটিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ‘ইন্ডোলজি’ বা ভারতবিদ্যার চর্চার ক্ষেত্রেও ঔপনিবেশিক প্রভাবের প্রসঙ্গ তোলেন শাহ। তাঁর বক্তব্য, ভারতকে নিয়ে জ্ঞানচর্চা দীর্ঘদিন ভারতের নিজস্ব কণ্ঠে হয়নি। বরং ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জ্ঞানকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

শাহের দাবি, এই প্রক্রিয়ার ফলে ভারতীয় সমাজের মধ্যে নিজেদের ইতিহাস ও জ্ঞানপরম্পরা নিয়ে আত্মবিশ্বাস দুর্বল করার একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তাঁর মতে, এখন সময় এসেছে ভারতীয় জ্ঞানভাণ্ডারকে ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুন করে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার।

এশিয়াটিক সোসাইটির বিপুল সংগ্রহশালা, পুঁথি, নথি ও দীর্ঘদিনের জ্ঞানভাণ্ডারকে দেশের কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি। প্রতিষ্ঠানটি কেন তৈরি হয়েছিল বা কারা তৈরি করেছিলেন, সেই বিতর্কে আটকে না থেকে সেখানে সঞ্চিত জ্ঞান কী ভাবে বৃহত্তর ভারত ও মানবকল্যাণে কাজে লাগানো যায়, তার উপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন শাহ।

নালন্দার প্রসঙ্গ তুলে জ্ঞান রক্ষার বার্তা

ভারতের প্রাচীন জ্ঞানচর্চার প্রসঙ্গে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের উদাহরণও টানেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, কোনও জ্ঞানভাণ্ডার ধ্বংস করা গেলেও মানুষের স্মৃতি ও পরম্পরায় থাকা জ্ঞানকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

শাহ বলেন, ‘নালন্দার গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। মাসের পর মাস সেখানে ধোঁয়া উঠতে পারে। কিন্তু মানুষের মনে স্মৃতি ও শ্রুতির মাধ্যমে যে জ্ঞান রয়েছে, সেই জ্ঞান কেউ ধ্বংস করতে পারে না।’

ইতিহাস, ভাষা, মূল্যবোধ, নথি ও সংস্কৃতির সংরক্ষণকে একটি দেশের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, যে দেশ নিজের অতীত ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে পারে না, সে দেশ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, একসময় তার অস্তিত্ব দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।


এশিয়াটিক সোসাইটিকে আরও বড় ভূমিকার বার্তা

অমিত শাহ আশা প্রকাশ করেন, আগামী দিনে মুম্বাইয়ের এশিয়াটিক সোসাইটি ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে।

তাঁর মতে, এই প্রতিষ্ঠানে বহু বছর ধরে যে জ্ঞান ও ঐতিহাসিক সম্পদ সঞ্চিত হয়েছে, তা শুধু সংগ্রহশালায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। গবেষণা, শিক্ষা এবং বৃহত্তর জনকল্যাণের কাজে সেই সম্পদকে ব্যবহার করতে হবে।

শাহের বক্তব্যে একই সঙ্গে উঠে আসে ভারতের সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের প্রসঙ্গ। তাঁর মতে, নিজের ইতিহাস ও জ্ঞানপরম্পরার প্রতি আস্থা রেখে আধুনিক ভারতের অগ্রগতির সঙ্গে সেই ঐতিহ্যকে যুক্ত করা প্রয়োজন। ভারতীয় জ্ঞানকে দেশের মানুষের পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তর মানবসমাজের কল্যাণে কাজে লাগানোর আহ্বানও জানান তিনি।

Related posts

Leave a Comment