26 C
Kolkata
September 8, 2026
রাজ্য

পাহাড়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ

কালিম্পং: খারাপ আবহাওয়ার কারণে সশরীরে কালিম্পংয়ে পৌঁছতে না পারলেও ভার্চুয়ালি জেলার প্রশাসনিক কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে পাহাড়ের চা-বাগান, চা-শ্রমিক, স্বাস্থ্য, আবাসন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে কড়া পদক্ষেপের বার্তাও দিয়েছেন তিনি।

পাহাড়ের চা-বাগানগুলির দীর্ঘদিনের সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বন্ধ, রুগ্ন এবং নানা সমস্যায় থাকা চা-বাগানগুলির স্থায়ী সমাধানে কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে। আসামের আদলে পশ্চিমবঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিক যোজনা ২০২১ কার্যকর করার উদ্যোগের কথা জানান তিনি।

এই প্রকল্পের আওতায় পাহাড় থেকে তরাই পর্যন্ত চা-বাগানগুলির পরিকাঠামোগত উন্নয়নে ৩২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে কাজ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। চা-বাগানগুলিতে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির উপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

উৎসবের মরসুমে চা-শ্রমিকদের বোনাস নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন শুভেন্দু। দুর্গাপূজা, দীপাবলি এবং ভাইফোঁটার আগে শ্রমিকদের ২০ শতাংশ বোনাস নিশ্চিত করতে শ্রম দপ্তরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। উৎসবের আগে শ্রমিক পরিবারগুলির হাতে বোনাস পৌঁছে দেওয়াকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে।

চা-বাগানের পাশাপাশি জিটিএ নিয়েও এ দিন সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, জিটিএ-র বাজেট দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ে উন্নয়নের কাজ আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার বার্তা দিয়েছেন তিনি।

জিটিএ-র বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, শিক্ষক নিয়োগ, পানীয় জল সরবরাহের প্রকল্প এবং বিভিন্ন উন্নয়ন পর্ষদের তহবিল ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লেপচা ও তামাং পর্ষদ-সহ মোট ১১টি উন্নয়ন পর্ষদের অর্থ ব্যবহারের বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে জানান তিনি।

এই অভিযোগের তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইপিএস আধিকারিক কালিয়াপ্পন জয়রমনও তদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। কমিটি পাহাড় ও উত্তরবঙ্গের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলি পরিদর্শন করে তদন্তের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে কাউকে রেহাই দেওয়া হবে না বলে কড়া বার্তা দেন শুভেন্দু। প্রয়োজন অনুযায়ী এফআইআর দায়ের, গ্রেপ্তার এবং আত্মসাৎ করা সরকারি অর্থ উদ্ধারের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। সরকারি তহবিল এবং সাধারণ মানুষের করের টাকা যাতে কোনওভাবেই অপব্যবহার না হয়, তা নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

পাহাড়ের স্বাস্থ্য পরিষেবাতেও বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। কালিম্পংয়ে নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরির কাজ দ্রুত শুরু হবে বলে আগেই ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি আয়ুষ্মান ভারত যোজনার আওতায় জেলার ২ লক্ষ ১৮ হাজারের বেশি মানুষকে স্বাস্থ্যবিমার সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই এক লক্ষের বেশি মানুষের কার্ড সক্রিয় হয়েছে বলে প্রশাসনিক পরিসংখ্যান তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।

যাঁরা আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের আওতায় আসতে পারবেন না, তাঁদের জন্য বিকল্প স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছেন শুভেন্দু। ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনা’র আওতায় এনে তাঁদের বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পাহাড়বাসীর জন্য একাধিক সুবিধার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। অন্নপূর্ণা যোজনার আওতায় যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময়ে উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এই অর্থ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিন উপলক্ষে বিশেষ কিস্তি দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

বিধবা ও বার্ধক্য ভাতার ক্ষেত্রেও বাড়তি সুবিধার কথা তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মাসিক ভাতা ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করার সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকার পাশাপাশি শহরাঞ্চলেও ১০০ দিনের কাজের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।

পাহাড়ের যুবকদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। পুলিশের বিশেষ বিভাগে অন্তত এক হাজার কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দ্রুত প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি। এর মধ্যে ৩০০টি পদ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

আবাসনের ক্ষেত্রেও কালিম্পংয়ের জন্য বড় পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। জেলার ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় ৮ হাজার ৩২৫টি নতুন বাড়ি তৈরির তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানান শুভেন্দু। আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যের কথাও জানিয়েছেন তিনি।

বর্ষার মরসুমে পাহাড়ে ধস ও তিস্তার বন্যার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনকে আরও প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুর্গত এলাকায় দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছে দিতে উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাহাড়ের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকার বরাদ্দের কথাও বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে।

এ দিনের অনুষ্ঠানে কালিম্পং জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মান জানানো হয়। পদ্মশ্রী প্রাপক চিকিৎসক জি এস ইয়েনজোন, পদ্মশ্রী প্রাপক চিকিৎসক একলব্য শর্মা, প্রয়াত পদ্মশ্রী প্রাপক কাজী সিংয়ের স্ত্রী দুর্গা সিং, চলচ্চিত্র নির্মাতা তুলসী ঘিমিরে, প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী লোকরাজ আগরওয়াল, মিরিক কলেজের অধ্যক্ষ শেরাপ ভুটিয়া এবং আধ্যাত্মিক নেতা মোহন প্রিয় আচার্যকে সম্মান জানানো হয়।

খারাপ আবহাওয়ার কারণে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি কালিম্পংয়ে যেতে না পারলেও ভার্চুয়াল মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক বার্তায় পাহাড়ের উন্নয়নের একাধিক দিক উঠে আসে। চা-বাগানের পুনরুজ্জীবন থেকে শ্রমিকদের উৎসবের বোনাস, স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে আবাসন এবং কর্মসংস্থান থেকে দুর্যোগ মোকাবিলা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই একাধিক পরিকল্পনা সামনে রেখে পাহাড়ে উন্নয়নের গতি বাড়ানোর বার্তা দিয়েছেন শুভেন্দু।

Related posts

Leave a Comment