আমদাবাদ: বিশ্ব আর্চারি প্যারা সিরিজ আমদাবাদ ২০২৬-এ দুরন্ত ছন্দে রয়েছেন ভারতের প্যারা তিরন্দাজ শীতল দেবী। মিশ্র দলগত বিভাগে বিশ্ব রেকর্ড ভাঙার পর এবার ব্যক্তিগত বিভাগেও দুর্দান্ত সাফল্য পেলেন তিনি। মহিলাদের কম্পাউন্ড বিভাগে সেমিফাইনাল জিতে সরাসরি পৌঁছে গেলেন সোনার পদকের লড়াইয়ে।
এর আগে প্রতিযোগিতার মিশ্র দলগত যোগ্যতা পর্বে রাকেশ কুমারের সঙ্গে জুটি বেঁধে নিজেদেরই বিশ্ব রেকর্ড ভেঙেছিলেন শীতল। ভারতীয় জুটি ১,৪০০ পয়েন্ট সংগ্রহ করে নতুন নজির গড়েন। এর আগে প্যারিস ২০২৪ প্যারালিম্পিক্সে তাঁদের দখলে ছিল ১,৩৯৯ পয়েন্টের রেকর্ড।
বিশ্ব রেকর্ড গড়ার সেই আত্মবিশ্বাসই ব্যক্তিগত ইভেন্টে কাজে লাগান শীতল। মহিলাদের কম্পাউন্ড বিভাগের র্যাঙ্কিং পর্বে সবার উপরে থেকে শেষ করেন তিনি। এরপর সেমিফাইনালে স্বদেশীয় সারিতাকে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেন। ফলে আমদাবাদে ভারতের পদক-আশার অন্যতম বড় মুখ এখন শীতল দেবী।
তবে ভারতের সব তিরন্দাজের জন্য দিনটি সমান সাফল্যের হয়নি। পুরুষদের কম্পাউন্ড বিভাগে তমান সিং ব্রোঞ্জ পদকের লড়াইয়ে পৌঁছেছেন। তাঁর প্রতিপক্ষ ইরাকের কাধিম আব্বাস। এর আগে রাউন্ড অব ১৬-তে রাকেশ কুমারকে হারিয়ে দিয়েছিলেন আব্বাস। র্যাঙ্কিং পর্বে দ্বিতীয় স্থানে থাকা রাকেশের অভিযান সেখানেই শেষ হয়।
পুরুষদের রিকার্ভ বিভাগে ভারতের জন্য দিনটি ছিল আরও কঠিন। যোগ্যতা পর্বে তৃতীয় স্থানে থাকা গুরবিন্দর সিং প্রথম রাউন্ডে বাই পেয়েছিলেন। কিন্তু রাউন্ড অব ১৬-তে চিনের গান জুনের কাছে হেরে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যান তিনি। একইভাবে প্রথম রাউন্ডে বাই পাওয়া সহজবীর সিংও রাউন্ড অব ১৬-তে স্লোভাকিয়ার ইভান ডেভিডের কাছে পরাজিত হন।
পিআরএম বিভাগেও ভারতের পরভিন এবং সুন্দি বিজয় শেষ ষোলো পার করতে পারেননি। নুরউদ্দিন, নবীন দালাল এবং বিনায়ক আমোল ব্রিডও রাউন্ড অব ১৬-তেই বিদায় নিয়েছেন। প্রথম রাউন্ডে বাই পাওয়া লালপাইও শেষ ষোলোতে পরাজিত হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যান।
অন্যদিকে মহিলাদের প্যারা রিকার্ভ বিভাগে তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ ভারতীয় ব্রোঞ্জ পদকের লড়াই। যোগ্যতা পর্বে তৃতীয় বাছাই ভবনা সেমিফাইনালে পৌঁছেছিলেন। সেখানে ইরানের দ্বিতীয় বাছাই সোমায়েহ রহিমি ঘাহদেরিজানির কাছে হারতে হয় তাঁকে। এবার ব্রোঞ্জের জন্য স্বদেশীয় রাজশ্রী ধনরাজ রাঠোড়ের মুখোমুখি হবেন ভবনা।
রাজশ্রীও কঠিন লড়াই পেরিয়ে ব্রোঞ্জের ম্যাচে জায়গা করে নিয়েছেন। রাউন্ড অব ১৬-তে তিনি অল্পের জন্য স্বদেশীয় পুজাকে হারিয়ে পরের ধাপে যান। এরপর একের পর এক নকআউট ম্যাচ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ভারতীয় প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে ব্রোঞ্জের লড়াই নিশ্চিত করেন।
পুরুষদের ডব্লিউ-১ বিভাগেও ভারতের পদকের আশা পুরোপুরি শেষ হয়নি। আদিল মহম্মদ নাজির আনসারি সেমিফাইনালে উঠতে পারেননি। চেকিয়ার ডেভিড দ্রাহোনিনস্কির কাছে পরাজিত হয়ে তাঁর অভিযান শেষ হয়। ফলে ভারতের নজর এখন শীতলের সোনা এবং বাকি পদকের লড়াইয়ে থাকা তিরন্দাজদের দিকে।
শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, প্রতিযোগিতা আয়োজনের ক্ষেত্রেও আমদাবাদ প্রশংসা কুড়োচ্ছে। বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতার পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা এবং পরিকাঠামোর প্রশংসা করেছেন। আন্তর্জাতিক মানের আয়োজনের সঙ্গে আমদাবাদের ব্যবস্থাপনাকে তুলনা করেছেন কেউ কেউ প্যারালিম্পিক্স ও এশিয়ান গেমসের মতো বড় ক্রীড়া আসরের সঙ্গেও।
৪ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হাতে বিশ্ব আর্চারি প্যারা সিরিজের উদ্বোধন হয়। ১৯টি দেশের মোট ১০৮ জন প্রতিযোগী এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। ভুটান, ব্রিটেন, চিন, বাংলাদেশ, ফ্রান্স, জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া এবং আমেরিকার মতো দেশের তিরন্দাজরা আমদাবাদে হাজির হয়েছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অমিত শাহ আমদাবাদের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া পরিকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি ক্রীড়া প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া সরঞ্জাম ও প্রকৌশল, ক্রীড়া চিকিৎসা, চোটের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যও তুলে ধরা হয়।
গুজরাতের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। ২০৩০ সালের কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের সম্ভাবনার পাশাপাশি ২০৩৬ সালের অলিম্পিক্সের জন্য আমদাবাদের আগ্রহের কথাও উঠে এসেছে।
তবে আপাতত যাবতীয় নজর তিরন্দাজির ময়দানেই। বিশ্ব রেকর্ডের পর শীতল দেবী যখন সোনার পদকের লক্ষ্যে ফাইনালে নামবেন, তখন তমান সিং এবং স্বাতী চৌধুরীর মতো ভারতীয় প্রতিযোগীরাও ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে দেশকে পদক এনে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নামবেন। ফলে আমদাবাদে প্যারা আর্চারির মঞ্চে ভারতের পদক-সম্ভাবনা এখনও যথেষ্ট উজ্জ্বল।
previous post
