চেন্নাই— চেন্নাইয়ের এমএ চিদম্বরম স্টেডিয়ামের পিচে প্রথম তিন দিনের খেলা দেখে ব্যাটারদের স্বর্গ বলেই মনে হচ্ছিল। না আছে তেমন বাউন্স, না গতি, না স্পিনারদের জন্য ভয় ধরানো ঘূর্ণি। এমন উইকেটে চোখ বন্ধ করে শট খেললেও খুব বেশি বিপদ হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেই পিচেই বল হাতে ম্যাচের রং বদলে দিলেন বাংলার দুই পেসার মহম্মদ শামি ও মুকেশ কুমার। তাঁদের দাপটে তৃতীয় দিনের শেষে দক্ষিণাঞ্চলের রান ৬ উইকেটে ২৪২। এখনও পূর্বাঞ্চলের থেকে ৪৬৬ রানে পিছিয়ে দক্ষিণাঞ্চল।
তৃতীয় দিনে শামি ১১ ওভার বল করে চারটি মেডেন-সহ মাত্র ১৭ রান দিয়ে তুলে নেন দু’টি উইকেট। মুকেশের শিকারও দু’টি। ১২ ওভারে ৩৬ রান খরচ করেন তিনি। দুই পেসারের নিয়ন্ত্রিত এবং বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়েই ম্যাচের ভার ক্রমশ পূর্বাঞ্চলের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

অথচ দক্ষিণাঞ্চলের ব্যাটিং দেখে শুরুতে মনে হয়েছিল, পূর্বাঞ্চলের মতো তারাও বড় রান তুলবে। কিন্তু ইনিংসের শুরুতেই মুকেশের বলে ধাক্কা খায় তারা। লেগ স্টাম্পের বাইরের বলে ব্যাট ছুঁইয়ে মাত্র এক রানেই ফিরে যান রিকি ভুঁই। আম্পায়ার অবশ্য তাঁকে আউট দেননি। কিন্তু ১৫ বছরের বৈভব সূর্যবংশী অধিনায়ক ঈশান কিশনকে রিভিউ নিতে বাধ্য করেন। পরে দেখা যায়, বৈভবের সিদ্ধান্ত একেবারেই সঠিক।
দেবদত্ত পডিক্কল ও নারায়ণ জগদীশন কিছুটা সামলে জুটি গড়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু মধ্যাহ্নভোজের বিরতির ঠিক আগে ধৈর্য হারান জগদীশন। শিখর মোহনের অফ স্টাম্পের বাইরের বলে অপ্রয়োজনীয় ভাবে ব্যাট চালিয়ে ৩২ রানে ফিরে যান তিনি। তাঁর আউটেই স্পষ্ট হয়ে যায়, সহজ পিচেও মনঃসংযোগ হারালে বিপদ হতে পারে।
এরপর বল যখন ৩৫ ওভার পুরনো, তখনই ম্যাচে নিজেদের ছাপ ফেলতে শুরু করেন শামি ও মুকেশ। পুরনো বলে শুরু হয় রিভার্স সুইং। আর তাতেই দক্ষিণাঞ্চলের ব্যাটারদের মনে তৈরি হয় সংশয়। শামির রিভার্স সুইং সামলাতে না পেরে ২৭ রানে ফিরে যান সাইক রশিদ।

এরপর মুকেশের বলে আরও বড় ধাক্কা খায় দক্ষিণাঞ্চল। অর্ধশতরান করে খেলছিলেন পডিক্কল। মুকেশের একটি আপাত নিরীহ বলে ছক্কা মারতে গিয়ে তিনি সোজা ফিল্ডারের হাতে ক্যাচ দিয়ে বসেন। ৬২ রানে আউট হওয়ার পর মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় তাঁকে। নিজের ভুলেই যে উইকেটটি দিয়েছেন, তা বুঝতে পেরেই হতাশ পডিক্কল।
এরপর দলের রান টেনে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব এসে পড়ে অধিনায়ক তিলক বর্মা এবং স্মরণ রবিচন্দ্রনের উপর। রঞ্জির গত মরসুমে সর্বাধিক রান করা স্মরণের দিকে তাকিয়ে ছিল দক্ষিণাঞ্চল। কিন্তু শামির দুরন্ত বোলিংয়ের সামনে তিনিও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি।
শামির বলে বারবার আক্রমণাত্মক শট খেলার চেষ্টা করছিলেন স্মরণ। কিন্তু ব্যাট-বলের সংযোগ হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত একটি বলে ব্যাটের কানায় বল লাগিয়ে ফেলেন তিনি। আম্পায়ার অবশ্য আউট দেননি। মজার বিষয়, শামিকেও তখন খুব একটা আবেদন করতে দেখা যায়নি।
ঈশান কিশন সাজঘরে থাকায় সেই সময় অধিনায়কত্বের দায়িত্বে ছিলেন বৈভব। মাত্র ১৫ বছর বয়সি এই ক্রিকেটার কোনও ঝুঁকি না নিয়ে রিভিউয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তাতেই মেলে সাফল্য। তৃতীয় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে স্মরণকে আউট ঘোষণা করা হয়। স্মরণ ফেরার পর বৈভবকে ঘিরে শামিদের উচ্ছ্বাসই বুঝিয়ে দেয়, এত অল্প বয়সে তাঁর নেতৃত্বে দলের সিনিয়র ক্রিকেটাররা কতটা আস্থা রাখছেন।

মুকেশ আরও একটি উইকেট পেতে পারতেন। তাঁর বলে ব্যাটের কানায় বল লাগিয়ে দিয়েছিলেন শ্রেয়স গোপাল। কিন্তু স্লিপে সহজ ক্যাচ ফেলে দেন বৈভব। ফলে মুকেশের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানে আর একটি উইকেট যোগ হয়নি। তবে দিনের শেষ ওভারে মহম্মদ কুরেশির বলে ২৬ রানে আউট হন গোপাল।
দিনের শেষে ৫৬ রানে অপরাজিত রয়েছেন তিলক বর্মা। অধিনায়ক একাই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ম্যাচের পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখান থেকে দক্ষিণাঞ্চলের ঘুরে দাঁড়ানো বেশ কঠিন। চেন্নাইয়ের নিষ্প্রাণ পিচে যখন ব্যাটারদের দাপটই হওয়ার কথা ছিল, তখন শামি-মুকেশের রিভার্স সুইংই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।
তৃতীয় দিনের শেষে তাই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই পূর্বাঞ্চলের হাতে। ৪৬৬ রানের বিশাল লিড এবং দক্ষিণাঞ্চলের ছয় উইকেট পড়ে যাওয়ার পর পূর্বাঞ্চলের শিবিরে এখন জয়ের গন্ধ। চতুর্থ দিনে তিলক বর্মার লড়াই কতটা দীর্ঘ হয়, সেটাই আপাতত ম্যাচের অন্যতম আকর্ষণ।
