খারাপ আবহাওয়ায় ভার্চুয়াল বৈঠকে শুভেন্দু
কালিম্পং: খারাপ আবহাওয়ার কারণে সশরীরে কালিম্পংয়ে উপস্থিত হতে না পারলেও মঙ্গলবার ভার্চুয়াল মাধ্যমে প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পাহাড়ের সামগ্রিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য পরিষেবা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন তিনি। কালিম্পংয়ে মেডিক্যাল কলেজ তৈরির পাশাপাশি গৃহহীনদের জন্য বাড়ি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক সাহায্য এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধা সম্প্রসারণের কথাও জানানো হয়েছে।
কালিম্পংয়ে মেডিক্যাল কলেজ তৈরির দীর্ঘদিনের দাবিতে এদিন বড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, রাজ্য বাজেটে ইতিমধ্যেই এই মেডিক্যাল কলেজের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কলকাতা থেকে রওনা হওয়ার আগেই স্বাস্থ্য সচিবকে প্রয়োজনীয় আর্থিক অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পরবর্তী কালিম্পং সফরে মেডিক্যাল কলেজের ভূমিপূজন করা হবে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের আওতায় কালিম্পংয়ের ২ লক্ষ ১৮ হাজার ৫০৩ জনকে কার্ড দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ১ লক্ষ ১৫ হাজার ৩১১টি কার্ড সক্রিয় হয়েছে বলে প্রশাসনিক বৈঠকে জানানো হয়। যাঁরা আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের আওতায় থাকবেন না, তাঁদের মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনার আওতায় এনে বিনামূল্যে সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার সুবিধা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
পাহাড়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। জিটিএ-র চেয়ারম্যান এবং কয়েকজন সদস্য পদত্যাগ করার পর আইএএস আধিকারিক মোহন্তীকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। স্থানীয় সাংসদ, বিধায়ক এবং জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে উন্নয়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জিটিএ-র বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়েও তদন্তের কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শিক্ষক নিয়োগ, পানীয় জলের অমৃত প্রকল্প এবং লেপচা ও তামাং বোর্ড-সহ ১১টি উন্নয়ন পর্ষদের তহবিল সংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে বলে জানানো হয়েছে। সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে এফআইআর, গ্রেপ্তার এবং অর্থ উদ্ধারের মতো পদক্ষেপ করা হবে বলেও কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
পাহাড়ে সাম্প্রতিক ধস এবং প্রতিকূল আবহাওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। নেপাল এবং মিরিক-সহ বিভিন্ন এলাকায় ধসের ঘটনা সামনে আসার পর পাহাড়ের জন্য ২৫৪ কোটি টাকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল মঞ্জুর করা হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সেচ দপ্তরের প্রধান সচিব রাজেশ সিনহা পাহাড়ে থেকে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন বলেও বৈঠকে জানানো হয়।
গত বছরের অক্টোবরের ধসে সর্বস্ব হারানো কালিম্পংয়ের ৭৩টি পরিবারকে ইতিমধ্যেই জমি দেওয়া হয়েছে। এবার সেই পরিবারগুলির প্রত্যেককে অতিরিক্ত ৩ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। দুর্যোগের পর পুনর্বাসনের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতেই এই পদক্ষেপ বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পেও কালিম্পংয়ের মানুষের জন্য একাধিক সুবিধার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। জেলার ১৫ হাজার যোগ্য মহিলাকে অন্নপূর্ণা যোজনার আওতায় মাসে ৩ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া শুরু হয়েছে। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর পরবর্তী কিস্তির টাকা সরাসরি সুবিধাভোগীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে বলে জানানো হয়েছে।
এর পাশাপাশি বার্ধক্য এবং বিধবা ভাতার পরিমাণও ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে। গ্রাম ও শহর উভয় এলাকায় ১২৫ দিনের কাজের নিশ্চয়তা এবং প্রধানমন্ত্রী সূর্য ঘর যোজনার সুবিধা আরও বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গৃহহীনদের জন্যও বড় ঘোষণা এসেছে কালিম্পং থেকে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে জমি রয়েছে এমন ৮ হাজার ৩২৫টি গৃহহীন পরিবারের জন্য প্রধানমন্ত্রী আবাসন যোজনায় বাড়ি তৈরির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলে পাহাড়ের বহু পরিবার স্থায়ী বাসস্থানের সুবিধা পেতে পারে বলে প্রশাসনের আশা।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, পাহাড়ের মানুষের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি ধাপে ধাপে পূরণ করা হবে। চা-বাগান থেকে পর্যটন, স্বাস্থ্য থেকে পরিকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন তিনি। খারাপ আবহাওয়ার মধ্যেও ভার্চুয়াল বৈঠকে একাধিক প্রকল্পের ঘোষণা ঘিরে কালিম্পংয়ের প্রশাসনিক মহলে তৎপরতা শুরু হয়েছে।
