নিজস্ব সংবাদদাতা, দার্জিলিং— পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যা এবং আগামী দিনের সমীকরণ নিয়ে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার প্রধান বিমল গুরুঙের সঙ্গে বৈঠকে বসলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শনিবার সকালে শিলিগুড়ির কাছে সুকনার একটি রিসর্টে এই বৈঠক হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন দার্জিলিঙের সাংসদ রাজু বিস্তা, পাহাড়ের বিজেপি বিধায়কেরা, গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার রোশন গিরি এবং গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের প্রধান তথা সুভাষ ঘিসিঙের পুত্র মন ঘিসিং।
পাহাড়ের তিন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিদের নিয়ে এই বৈঠক হওয়ায় উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে এর গুরুত্ব যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর কেন্দ্র ও রাজ্যে বিজেপির সরকার থাকায় পাহাড়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

দু’দিনের উত্তরবঙ্গ সফরে বৃহস্পতিবার রাতে রাজ্যে আসেন অমিত শাহ। শুক্রবার শিলিগুড়ির রানিডাঙায় তাঁর একাধিক কর্মসূচি ছিল। ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সশস্ত্র সীমা বলের উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার সদর দপ্তরে প্রায় ১৮৯ কোটি টাকার একাধিক প্রশাসনিক ও আবাসিক প্রকল্পের শিলান্যাস করেন তিনি। পাশাপাশি কয়েকটি নতুন প্রকল্পের উদ্বোধনও করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এর পর শনিবার সকালে বিমল গুরুঙদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন শাহ। সফরের শেষ দিনে তাঁর আরও একটি বৈঠক করার কথা রয়েছে। তার পরেই দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর।
শনিবারের বৈঠকে পাহাড়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবি, গোর্খা টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ক্ষমতা ও কার্যকারিতা, পাহাড়ের শিক্ষক নিয়োগ, চা-বাগানের সমস্যা এবং পরিবহণ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা বিজেপিকে সমর্থন করেছিল। নির্বাচনে দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলার ছ’টি বিধানসভা আসনেই বিজেপি প্রার্থীরা জয়ী হন। ফলে পাহাড়ে বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিমল গুরুঙের সঙ্গে অমিত শাহের বৈঠককে আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে কলকাতায় এসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন বিমল গুরুঙ ও রোশন গিরি। সেই বৈঠকে পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। বৈঠকের পর বিমল জানিয়েছিলেন, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব। কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকায় দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

গোর্খাল্যান্ডের দাবি পাহাড়ের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন সময়ে এই দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন, সংঘাত এবং রাজনৈতিক টানাপড়েন হয়েছে। বিমল গুরুঙের সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে সেই পুরনো দাবির পাশাপাশি পাহাড়ের প্রশাসনিক ও আর্থিক সমস্যাগুলিও আলোচনায় উঠে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্য দিকে, মন ঘিসিংয়ের উপস্থিতিও এই বৈঠককে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে। পাহাড়ের পুরনো রাজনৈতিক শক্তি গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট এবং গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার প্রতিনিধিদের একসঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক পাহাড়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে একই আলোচনার পরিসরে আনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এখন দেখার, সুকনার এই বৈঠক থেকে পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট রূপরেখা বেরিয়ে আসে কি না। তবে অমিত শাহ, বিমল গুরুঙ, মন ঘিসিং এবং বিজেপির পাহাড়ের নেতৃত্বের একসঙ্গে বসা আগামী দিনের পাহাড়ি রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
