কলকাতা — রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর দলের নিচুতলায় একাধিক অভিযোগ সামনে আসায় সাংগঠনিক শৃঙ্খলা আরও শক্ত করতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করছে বিজেপি। দলের আদর্শ, সাংগঠনিক নিয়ম এবং ক্ষমতাসীন দলের কর্মী হিসাবে বর্তমান সময়ে কী ভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে, তা নিয়ে প্রায় ৩৫০ জন নেতা প্রথমে প্রশিক্ষণ নেবেন। পরে তাঁরাই জেলায় জেলায় গিয়ে অন্য নেতা-কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবেন।
শ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে এই প্রশিক্ষণ শিবির হবে। জেলা সভাপতি, জেলা ইনচার্জ, সংগঠন থেকে উঠে আসা বাছাই করা বিধায়ক, রাজ্য মোর্চার সভাপতি এবং রাজ্য কমিটির সদস্যদের মধ্যে থেকে প্রায় ৩৫০ জনকে এই কর্মসূচির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। দলের লক্ষ্য, রাজ্য থেকে জেলা এবং জেলা থেকে নিচুতলা পর্যন্ত সাংগঠনিক নির্দেশ একই ভাবে পৌঁছে দেওয়া।

আগামী ১৬ আগস্ট কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রশিক্ষণ দেবেন। সর্বভারতীয় যুগ্ম সম্পাদক (সংগঠন) শিবপ্রকাশের ক্লাস দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব শুরু হবে। দলের সাংগঠনিক কাজের পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নেতা-কর্মীদের দায়িত্ব কী হওয়া উচিত, কোথায় দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙার আশঙ্কা রয়েছে এবং সেই পরিস্থিতি কী ভাবে সামলাতে হবে, তা নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি।

সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বনশলও প্রশিক্ষণ দেবেন। এ ছাড়া মঙ্গল পাণ্ডে, অমিত মালব্য, তিনেশানন্দ গোস্বামী এবং সাংসদ কবিতা পতিধর প্রশিক্ষক হিসাবে থাকবেন। রাজ্যের পক্ষ থেকে শমীক ভট্টাচার্য, অমিতাভ চক্রবর্তী, জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় এবং দীপক বর্মন প্রশিক্ষণ দেবেন।
বিজেপির কাছে এবারের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতি করার পরে এখন দলকে সরকার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করতে হচ্ছে। আন্দোলন এবং সরকারের বিরোধিতা করার সময় যে ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকা নিতে হয়, ক্ষমতায় থাকার পরে সেই ভূমিকা বদলে যায়। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নেতা-কর্মীদের দ্রুত মানিয়ে নেওয়াই প্রশিক্ষণের অন্যতম উদ্দেশ্য।
দলের নিচুতলায় ক্ষমতার প্রভাব নিয়ে যে অভিযোগ উঠছে, সেটিও নেতৃত্বের চিন্তার কারণ। বিভিন্ন জায়গা থেকে দলীয় শৃঙ্খলা বিরোধী আচরণ এবং তোলাবাজির অভিযোগ এসেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। এই ধরনের অভিযোগের কারণে দলের ভাবমূর্তি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে নেতা-কর্মীদের সতর্ক করতে চাইছে বিজেপি।
রাজ্য বিজেপির তরফে দাবি করা হয়েছে, দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙা এবং অনৈতিক কাজের অভিযোগে এখনও পর্যন্ত প্রায় ২৫০ জনকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। দলের নিচুতলায় এই ধরনের অভিযোগ যাতে আর না বাড়ে, তার জন্য আদর্শগত শিক্ষার পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতিতে দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিষয়টিকেও প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা হয়েছে।

এই প্রশিক্ষণ শুধু রাজ্য স্তরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রথম পর্বে প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রায় ৩৫০ জনকে পরে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হবে। তাঁরা জেলা স্তরের নেতা-কর্মীদের নিয়ে পৃথক প্রশিক্ষণ শিবির করবেন। ২২ থেকে ৩০ আগস্টের মধ্যে এই কর্মসূচি হওয়ার কথা। প্রতিটি শিবির এক রাত ও দুই দিনের হবে।
জেলা স্তরের প্রশিক্ষণে বিজেপির রাজনৈতিক ইতিহাস এবং আদর্শগত ভিত্তিও গুরুত্ব পাবে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে জনসঙ্ঘের পথ ধরে বিজেপির তৈরি হওয়ার ইতিহাস তুলে ধরা হবে। দলের বর্তমান নেতা-কর্মীদের নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ ও সংগঠনের মূল ভাবনার সঙ্গে ফের যুক্ত করাই এই পর্বের অন্যতম লক্ষ্য।
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন হিসাবে তুলে ধরে। রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে সেই সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ধরে রাখাই এখন নেতৃত্বের অন্যতম বড় পরীক্ষা। ৩৫০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের মাধ্যমে জেলার পর জেলা সংগঠনের নিচুতলায় বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা সেই পরীক্ষারই অংশ।
