35 C
Kolkata
April 24, 2026
রাজ্য

মৃত ভোটার বাদ পড়তেই ভোটদানের হার বৃদ্ধি

পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার ভোটে প্রায় ৯১ শতাংশ ভোটদানের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক জল্পনা বাড়িয়েছে। এই বিপুল ভোটের হার সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক নির্বাচনী রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু এই উচ্চ অংশগ্রহণের প্রকৃত কারণ কী—তা নিয়ে শাসক ও বিরোধী শিবিরে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। একদিকে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস বলছে, তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় বহু নাম বাদ পড়ায় মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, বিরোধী দল বিজেপি দাবি করছে, ‘পরিবর্তনের হাওয়া’ই এই বিপুল ভোটদানের আসল কারণ। বাস্তব বিশ্লেষণ করলে ছবিটা কতটা ভিন্ন, সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

প্রথমে দেখা যাক, ভোটের হার নিয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা কী? মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, বিশেষ তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় বহু মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এর ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেছেন, ভোট না দিলে ভবিষ্যতে তাঁদের নামও তালিকা থেকে বাদ যেতে পারে। এই মানসিকতা থেকেই মানুষ বেশি করে ভোট দিতে এগিয়ে এসেছেন।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের দাবি, এই বিপুল ভোটদানের হার আসলে পরিবর্তনের পক্ষে জনসমর্থনেরই প্রতিফলন। প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষও বলেছেন, ‘মানুষ পরিবর্তন চাইছে বলেই এত বেশি ভোট পড়ছে’। অর্থাৎ দুই পক্ষই নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী এই উচ্চ ভোটদানের ব্যাখ্যা দিচ্ছে।

কিন্তু পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে অন্য একটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্বাচন কমিশনের তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া বা এসআইআর নিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৬৪ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের একটি বড় অংশই মৃত ভোটার বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও সরকারিভাবে মৃত ভোটারের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি, রাজনৈতিক মহলের অনুমান, মোট ভোটারের প্রায় ৭ শতাংশ বা তারও বেশি মৃত ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে।

এখানেই মূল বিষয়টি লুকিয়ে রয়েছে। ২০২৫ সালের খসড়া তালিকা অনুযায়ী রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ। তার মধ্যে যদি কয়েক লক্ষ মৃত ভোটার দীর্ঘদিন ধরে তালিকায় থেকে যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ভোটদানের শতাংশ কম দেখাবে। কারণ এই মৃত ভোটাররা তো বাস্তবে ভোট দিতে আসবেন না। ফলে তালিকায় তাঁদের নাম থাকা মানেই মোট ভোটারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, আর বাস্তবে ভোটদানের হার তুলনামূলক কম দেখানো।

এবার যখন এই মৃত ভোটারদের একটি বড় অংশ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তখন মোট ভোটারের সংখ্যা কমে এসেছে। ফলে একই সংখ্যক জীবিত ভোটার ভোট দিলেও শতাংশের হিসেবে তা অনেক বেশি দেখাচ্ছে। অর্থাৎ, ভোটদানের হার বেড়েছে, কিন্তু বাস্তবে ভোট দিতে আসা মানুষের সংখ্যায় তেমন কোনও বড় পরিবর্তন নাও থাকতে পারে।

এই তত্ত্ব যাচাই করতে হলে অতীতের নির্বাচনের সঙ্গে বর্তমানের ভোটদানের প্রকৃত সংখ্যা তুলনা করা জরুরি। যদি দেখা যায়, আগের নির্বাচনে যত মানুষ ভোট দিয়েছেন, এবারও প্রায় একই সংখ্যক মানুষ ভোট দেন, তাহলে পরিষ্কার বোঝা যাবে যে, শতাংশ বৃদ্ধির পিছনে মূল কারণ তালিকার পরিবর্তন, মানুষের আচরণের আমূল বদল নয়।

এর পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে— বিচারাধীন বা যাচাইকরণে থাকা ভোটারদের সমস্যা। বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন নথি জমা দিতে বলা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় অনেকেই হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে একাংশ ভোটার ক্ষুব্ধ হয়েছেন। নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগে আরও সচেতন হয়েছেন।

আবার অন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও কাজ করেছে। অনেকেই মনে করেছেন, যদি নিয়মিত ভোট না দেন, তাহলে ভবিষ্যতে তাঁদের নামও তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে। এই আশঙ্কা থেকেও কিছু মানুষ ভোট দিতে আগ্রহী হয়েছেন। যদিও এই সংখ্যাটি মোট ভোটারের তুলনায় খুব বড় নয়, তবুও সামগ্রিক চিত্রে এর প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রথম দফার প্রায় ৯২ শতাংশ ভোটদানকে শুধুমাত্র ‘পরিবর্তনের হাওয়া’ বা ‘শাসকপন্থী সমর্থন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট সরলীকরণ করা হবে। বাস্তবে এর পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ। বিশেষত ভোটার তালিকা থেকে মৃত নাম বাদ পড়া, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার প্রভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া।

তবে এই উচ্চ ভোটদানের প্রকৃত রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝা যাবে ভোটগণনার ফল প্রকাশের পরই। আগামী ৪ মে ফলাফল ঘোষণার পরই স্পষ্ট হবে। ভোট প্রদানে এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণ কোন পক্ষে গিয়েছে, তার আগে পর্যন্ত এই ভোটের হার নিয়ে জল্পনা ও বিশ্লেষণ চলতেই থাকবে।

Related posts

Leave a Comment