নিজস্ব প্রতিনিধি— নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি বহুতলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ন’জনের মৃত্যুর পর হোটেল ও অতিথিশালার নিরাপত্তা নিয়ে কড়া পদক্ষেপের পথে রাজ্য সরকার। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা হোটেল এবং অতিথিশালায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষ অডিট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দমকল দপ্তরের অনুমতি, জরুরি নির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা-সহ একাধিক বিষয় এই পরিদর্শনের আওতায় আসবে।
নিউ মার্কেটের ঘটনার পর দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। দমকল দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। কী ভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়ল, বহুতলের ভিতরে কী ধরনের সমস্যা ছিল এবং উদ্ধারকাজের সময় কোথায় কোথায় বাধা তৈরি হয়েছিল, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

দমকলমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় থাকা বেসরকারি হোটেল ও অতিথিশালাগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে। কোনও হোটেল দমকলের প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া চলছে কি না, আগুন লাগলে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসার রাস্তা রয়েছে কি না এবং অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে কি না, তা দেখা হবে। পাশাপাশি জরুরি নির্গমনপথ কোনও ভাবে বন্ধ করে রাখা হয়েছে কি না, সেটিও পরিদর্শনের সময় খতিয়ে দেখা হবে।

এই প্রসঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের সময়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দমকলমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, আগের সময়ে নিয়ম না মেনে বহু হোটেল ও অতিথিশালা তৈরি এবং চালানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তাঁর কথায়, ‘পূর্বতন সরকারের অভিশাপ আমাদের বহন করতে হচ্ছে।’ নতুন করে যাতে কোনও হোটেল বা অতিথিশালা নিরাপত্তার নিয়ম ভেঙে না চলে, সে দিকেও নজর দেওয়া হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। লালবাজারের তরফে বিশেষ তদন্তকারী দল তৈরি করা হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, ওই বহুতলের বিভিন্ন তলায় একাধিক হোটেল ও অতিথিশালা ছিল। ঘরগুলি ঘিঞ্জি হওয়ায় আগুনের পাশাপাশি দ্রুত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ভিতরে থাকা মানুষজনের বেরিয়ে আসতে সমস্যা হয় বলে দমকল আধিকারিকদের প্রাথমিক অনুমান।

এই ঘটনায় ন’জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ছ’জন পুরুষ, দু’জন মহিলা এবং একটি শিশু রয়েছে। এর ঠিক আগের দিন তারাপীঠের একটি বেসরকারি হোটেলেও আগুনে ন’জনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই ঘটনায় হোটেল মালিক প্রবীর পাল এবং তাঁর ছেলে কল্যাণ আশিস পালকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পরপর দুই ঘটনায় হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সরকারের অডিটের সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্র, বাজার এলাকা এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে ছোট জায়গায় বেশি সংখ্যক অতিথিকে রাখা হোটেলগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন প্রশাসনের আধিকারিকেরা।
এদিকে, অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল পূর্ববর্তী সরকারের সময়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পালটা প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম জানিয়েছেন, অগ্নিনিরাপত্তার অনুমতি এবং অডিটের বিষয়টি দমকল দপ্তরের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
তবে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা। হোটেলে থাকা কোনও অতিথি যাতে আগুন লাগার পর বেরোনোর রাস্তা খুঁজতে গিয়ে আটকে না পড়েন, তার জন্য আগে থেকেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাজ্যজুড়ে প্রস্তাবিত অডিটে যদি নিয়মভঙ্গ ধরা পড়ে, সংশ্লিষ্ট হোটেলগুলির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেও নজর থাকবে।
নিউ মার্কেট ও তারাপীঠের পর পর অগ্নিকাণ্ড দেখিয়ে দিয়েছে, হোটেল ও অতিথিশালায় অগ্নিনিরাপত্তার সামান্য গাফিলতিও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই শুধু অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত নয়, আগুন লাগার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়াকেই এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে রাজ্য সরকার।

