29 C
Kolkata
October 4, 2026
দেশ বিদেশ

আমেরিকা-চিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘গোল্ডিলক্স পরিস্থিতি’ দরকার, বললেন জয়শঙ্কর

নয়াদিল্লি— আমেরিকা (US) ও চিনের (China) ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে এমন একটি ভারসাম্য প্রয়োজন, যেখানে প্রতিযোগিতা অতিরিক্ত তীব্রও হবে না, আবার পুরোপুরি মুছেও যাবে না। রবিবার নয়াদিল্লিতে মিউনিখ লিডার্স মিটিংয়ে (Munich Leaders Meeting) বক্তব্য রাখতে গিয়ে এমনই মন্তব্য করলেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S Jaishankar)। তাঁর কথায়, এই পরিস্থিতিকে ‘গোল্ডিলক্স পরিস্থিতি’ বলা যায়—অর্থাৎ উত্তাপ যেন না হয় অতিরিক্ত, আবার সম্পর্কও যেন অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে না যায়।

৪ ও ৫ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে আয়োজিত মিউনিখ লিডার্স মিটিংয়ে বিদেশ ও নিরাপত্তা নীতি নিয়ে আলোচনা করছেন বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা। সেই মঞ্চেই বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং আমেরিকা-চিন সম্পর্কের প্রভাব নিয়ে নিজের মত তুলে ধরেন জয়শঙ্কর।

জয়শঙ্করের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল আমেরিকার অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। এর পাশাপাশি অর্থনীতি, বাণিজ্য, উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।

তিনি বলেন, ‘আমেরিকা-চিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে আমরা যে পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে আছি, তাকে প্রায়ই গোল্ডিলক্স পরিস্থিতি বলা হয়। প্রতিযোগিতা খুব বেশি উত্তপ্ত হওয়া উচিত নয়, আবার এতটাও ভালো হওয়া উচিত নয় যে প্রতিযোগিতাই আর থাকে না। সঠিক তাপমাত্রার মাঝামাঝি জায়গাটিই প্রয়োজন।’

আমেরিকার অবস্থানে পরিবর্তন, বাড়ছে চিনের প্রভাব

জয়শঙ্কর বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল আমেরিকার ‘আমূল পুনর্বিন্যাস’। তাঁর মতে, ওয়াশিংটন নিজের অবস্থানকে নতুন করে নির্ধারণ করছে এবং এর পাশাপাশি চিনের উত্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনছে।

তাঁর বক্তব্য, ‘আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল চিনের উত্থান। আর আমরা অত্যন্ত তীব্র প্রতিযোগিতা দেখতে পাচ্ছি।’

এই প্রতিযোগিতা এখন শুধু সামরিক শক্তি বা কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাণিজ্য, উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজারের নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রয়ক্ষমতাও আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন বিদেশমন্ত্রী।

জয়শঙ্কর বলেন, পারস্পরিক নির্ভরশীল বিশ্বের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হল—কোন দেশের হাতে কোন ধরনের প্রভাব রয়েছে। সরবরাহকারী বেশি শক্তিশালী, নাকি ক্রেতা? উৎপাদন নিয়ন্ত্রণকারী দেশের প্রভাব বেশি, নাকি বড় বাজারের অধিকারী দেশের? তাঁর মতে, একাধিক ক্ষেত্রে প্রভাব ধরে রাখার পাশাপাশি সেই প্রভাব ব্যবহারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও আন্তর্জাতিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বড় শক্তির বাইরে নিজেদের স্বার্থ দেখছে বিভিন্ন দেশ

আমেরিকা ও চিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে উদীয়মান এবং মাঝারি শক্তির শগুলির অবস্থান নিয়েও বক্তব্য রাখেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, এই দেশগুলি এখন আর শুধুমাত্র বড় শক্তিগুলির সঙ্গে নির্দিষ্ট জোটের উপর নির্ভর করে থাকতে চাইছে না। বরং নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে সম্পর্ক ও অংশীদারিত্ব নতুন করে সাজাচ্ছে।

তিনি বলেন, উদীয়মান ও মাঝারি শক্তির দেশগুলির মধ্যে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে মিল রয়েছে—তারা নিজেদের স্বার্থ সম্পর্কে ক্রমশ বেশি সচেতন হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই স্বনির্ভরতার দিকে এগোচ্ছে।

ভারতের ‘আত্মনির্ভর’ নীতির কথাও উল্লেখ করেন বিদেশমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বিভিন্ন দেশ এখন ভাবছে, আলোচনার টেবিলে তারা নিজেরা কী নিয়ে আসতে পারে এবং কোনও অংশীদারিত্বে তাদের নিজস্ব শক্তি কোথায়।

ঝুঁকি কমাতে সম্পর্কের বৈচিত্র্য বাড়ানোর বার্তা

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ অর্থনীতি ও নিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি কমাতে চাইছে বলেও মন্তব্য করেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, সরবরাহ ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল করতে এবং কোনও একটি দেশ বা অঞ্চলের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে অংশীদারিত্বের পরিধি বাড়ানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেক দেশ এখন অর্থনীতি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বৈচিত্র্য আনছে এবং ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে।

এর ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বড় শক্তির নেতৃত্বাধীন কঠোর জোটের পাশাপাশি নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক সহযোগিতার নতুন কাঠামোও তৈরি হচ্ছে বলে ইঙ্গিত দেন বিদেশমন্ত্রী।

সব বিষয়ে একমত না হলেও একসঙ্গে কাজ সম্ভব

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সব বিষয়ে সম্পূর্ণ ঐকমত্যের প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, দুটি দেশের মধ্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক অভিন্ন স্বার্থ বা সহযোগিতার ক্ষেত্র থাকলেই তারা একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

তিনি বলেন, উদীয়মান ও মাঝারি শক্তির দেশগুলির ক্ষেত্রে ‘যুক্তিসঙ্গত মাত্রার অভিন্নতা’ই সহযোগিতার ভিত্তি হতে পারে। প্রতিটি বিষয়ে একই মত বা সম্পূর্ণ স্বার্থের মিল থাকা প্রয়োজন—এমন ধারণা বর্তমান বিশ্বের জন্য অত্যন্ত কঠিন মানদণ্ড।

জয়শঙ্করের বক্তব্য, পর্যাপ্ত ‘সহযোগিতার ক্ষেত্র’ থাকলে দেশগুলি একসঙ্গে কাজ করতে পারে। আর এই ধরনের সহযোগিতা, ঝুঁকি কমানো এবং সম্পর্কের বৈচিত্র্যই ধীরে ধীরে নতুন আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তুলছে।

Related posts

Leave a Comment