কলকাতা, ২৬ জুন: গুজরাত ও উত্তরপ্রদেশের ধাঁচে সংগঠিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপ দমনে নতুন আইন আনতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’ নামে নতুন এই বিলের গেজেট বিজ্ঞপ্তি ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। আগামী সোমবার বিধানসভায় বিলটি পেশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একইসঙ্গে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার অ্যাক্ট, ১৯৭২’-এর সংশোধনী বিলও আনা হচ্ছে, যার মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনায় অভিযুক্তদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি ব্যবস্থা চালু করতে চায় সরকার।
রাজ্যে সরকার গঠনের পর থেকেই সংগঠিত অপরাধ ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়নের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যপালের ভাষণের উপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় তিনি জানিয়েছিলেন, চলতি অধিবেশনেই এই আইন আনা হবে। নতুন বিলে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সংগঠিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই এই আইনের মূল উদ্দেশ্য।
বিল অনুযায়ী, জননিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত কোনও ব্যক্তিকে এক বছর পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক আটক রাখা যাবে। পাশাপাশি ভারতীয় ন্যায় সংহিতার প্রাসঙ্গিক ধারার সঙ্গে সমন্বয় করে সংগঠিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও সরকারের হাতে থাকবে। সমাজবিরোধী কার্যকলাপের আওতায় এমন সব অপরাধকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করে, বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করে, কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ, বনজ সম্পদ ও সরকারি সম্পত্তির অবৈধ ব্যবহার বা ক্ষতির সঙ্গে জড়িত।
বিলে ‘গুন্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও একাধিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। সংগঠিত অপরাধচক্রের সদস্য বা নেতা, ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংগঠিত অপরাধ সংক্রান্ত ধারায় চার্জশিটভুক্ত ব্যক্তি, অস্ত্র, মাদক, মানবপাচার বা বিস্ফোরক আইনের অধীনে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং সমাজের জন্য বিপজ্জনক বলে পরিচিত ব্যক্তিদের এই আইনের আওতায় আনা যাবে।
নতুন আইনে কোনও ব্যক্তিকে আটক করার জন্য পুলিশ সুপার বা তার ঊর্ধ্বতন আধিকারিকের রিপোর্টের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার নির্দেশ দিতে পারবে। আবার পুলিশ কমিশনার বা জেলাশাসক জরুরি পরিস্থিতিতে আটক করার নির্দেশ দিলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি পলাতক হলে আদালতের মাধ্যমে হাজিরার নির্দেশ জারি করা হবে এবং নির্দেশ অমান্য করলে তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আইন কার্যকর করার জন্য একটি অ্যাডভাইজরি বোর্ড গঠন করা হবে, যার প্রধান থাকবেন হাই কোর্টের বর্তমান বা প্রাক্তন বিচারপতি। বোর্ডে আরও দু’জন সদস্য থাকবেন, যাঁরা উচ্চ আদালতের বিচারপতি হওয়ার যোগ্য। আটক ব্যক্তি নিজের পক্ষে প্রতিনিধি নিয়োগ করে বক্তব্য পেশ করার সুযোগ পাবেন। এছাড়া কোনও ব্যক্তি অশান্তি সৃষ্টি করতে পারেন বলে আশঙ্কা হলে তাঁকে নির্দিষ্ট এলাকা থেকে বহিষ্কার বা সেখানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষমতাও পুলিশকে দেওয়া হচ্ছে।
একইসঙ্গে সংশোধনী বিলে ক্লেমস কমিশন গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিক্ষোভ বা আন্দোলনের নামে সরকারি কিংবা বেসরকারি সম্পত্তি নষ্ট হলে ক্ষতিপূরণের আবেদন এই কমিশনের কাছে করা যাবে। তদন্তের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে এবং অভিযুক্তদের কাছ থেকেই সেই অর্থ আদায় করবে সরকার।
রাজ্য সরকারের দাবি, সংগঠিত অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী করতেই এই নতুন আইন আনা হচ্ছে। তবে উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাতের অনুরূপ আইন নিয়ে অতীতে মানবাধিকার সংগঠনগুলির আপত্তির নজির থাকায়, পশ্চিমবঙ্গেও এই বিলকে ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
