কলকাতা, ৬ জুন ২০২৬: ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রখ্যাত তবলা শিল্পী উস্তাদ সাবির খান-এর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সঙ্গীতমহল। গত ১৪ মে তাঁর মৃত্যু ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের এক স্বর্ণালী অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়েছে। অসাধারণ প্রতিভা, অনন্য পরিবেশনশৈলী এবং মানবিক গুণাবলীর জন্য তিনি শিল্পী মহলে বিশেষ সম্মান অর্জন করেছিলেন।
১৯৫৯ সালের ৪ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের রামপুরে জন্মগ্রহণ করেন সাবির খান। তিনি ছিলেন কিংবদন্তি তবলা শিল্পী উস্তাদ করামতউল্লাহ খান এবং লাইকা বেগমের পুত্র। অতি অল্প বয়স থেকেই তাঁর সঙ্গীত প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। মাত্র নয় বছর বয়সে কলকাতায় তাঁর দাদু উস্তাদ মাসিদ খান এবং বাবার সঙ্গে মঞ্চে তবলা পরিবেশন করে সবার নজর কাড়েন তিনি। খুব দ্রুতই তিনি ‘চাইল্ড প্রডিজি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
ফরুকাবাদ ঘরানার ৩৩তম প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে সাবির খান তবলার একক পরিবেশনা এবং গায়ক, বাদ্যযন্ত্রী ও নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গত করার ক্ষেত্রে অসামান্য দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। কৈশোরেই তিনি উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান, পণ্ডিত ভীমসেন যোশী এবং উস্তাদ বিলায়েত খান-এর মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নিয়েছিলেন। তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওর সর্বকনিষ্ঠ টপ গ্রেড শিল্পীদের অন্যতম ছিলেন এবং পরবর্তীকালে সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারেও সম্মানিত হন।
তাঁর দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে পণ্ডিত রবিশঙ্কর, উস্তাদ আলি আকবর খান, পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, উস্তাদ আমজাদ আলি খান, বেগম পারভিন সুলতানা, গিরিজা দেবী, শোভা গুর্তু এবং পণ্ডিত বিরজু মহারাজ-সহ অসংখ্য কিংবদন্তি শিল্পীর সঙ্গে তিনি পরিবেশন করেছেন। পাশাপাশি পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা, পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, ড. এল. সুব্রহ্মণ্যম, উস্তাদ শুজাত খান এবং উস্তাদ রশিদ খান-এর মতো সমকালীন শিল্পীদের সঙ্গেও তাঁর যুগলবন্দি বিশেষ প্রশংসিত হয়েছিল।
শুধু তবলা বাদক হিসেবেই নয়, তিনি ছিলেন একজন সুরকার, গজল শিল্পী এবং শিক্ষকও। বহু গজল গায়ক ও কথক নৃত্যশিল্পী তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। সঙ্গীতকে পারিবারিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ না রেখে সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন তিনি। তাঁর তিন পুত্র—আরিফ, আসিফ এবং আমিন খান—এবং অসংখ্য শিষ্য আজও তাঁর সঙ্গীত ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন।
উস্তাদ সাবির খানের প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পীরা। উস্তাদ শুজাত খান স্মৃতিচারণ করে বলেন, পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্ক এবং অসংখ্য ঐতিহাসিক কনসার্টের স্মৃতি আজও তাঁকে আবেগতাড়িত করে। অন্যদিকে পার্থ বসু তাঁর অসাধারণ মানবিক গুণাবলি এবং সুরের গভীরতার কথা উল্লেখ করেছেন। পণ্ডিত দেবাশিস ভট্টাচার্য তাঁকে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা তবলা শিল্পী হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সঙ্গীতের প্রতি নিবেদন, শিল্পচর্চার উৎকর্ষ এবং মানবিক মূল্যবোধের জন্য উস্তাদ সাবির খান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর প্রয়াণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
