নিজস্ব সংবাদদাতা, বীরভূম— তারাপীঠের ‘বিদেশিনী’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এবার গ্রেপ্তার করা হল হোটেল মালিক কল্যাণ পালের বাবা প্রবীর পালকে। সোমবার গভীর রাতে তারাপীঠ থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এর আগে হোটেল মালিক কল্যাণ পালকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের সূত্রে খবর, বাবা-ছেলে মিলেই ওই হোটেল পরিচালনা করতেন।
সোমবার ভোরে তারাপীঠ মন্দিরের কাছে ‘বিদেশিনী’ হোটেলে আচমকাই আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভয়াবহ আকার নেয়। এই অগ্নিকাণ্ডে এখনও পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। মৃতদের মধ্যে মেঘালয়ের বাসিন্দা পাঁচজন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের দুই শিশুও ছিল বলে জানা গিয়েছে।
তদন্তকারীদের সূত্রে খবর, আগুন লাগার সময় হোটেলে আবাসিক ও কর্মী মিলিয়ে মোট ৪৩ জন ছিলেন। প্রাথমিকভাবে ২২ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁদের মধ্যে ৯ জনের মৃত্যু হয়। অধিকাংশ আবাসিকের সন্ধান মিললেও কয়েকজনের এখনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। ফলে নিখোঁজদের কেউ আতঙ্কে হোটেল সংলগ্ন পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছিলেন কি না, অথবা পুকুরে কোনও দেহ পড়ে রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
মঙ্গলবার সকালে পুকুরে ডুবুরি নামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। হোটেল সংলগ্ন এলাকা এবং পুকুরে দীর্ঘক্ষণ ধরে তল্লাশি চালিয়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে যাতে কোনও বিভ্রান্তি না থাকে, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রাথমিক তদন্তে শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। হোটেলের অন্দরসজ্জায় ফাইবার জাতীয় সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। দাহ্য সামগ্রী থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে বলে তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান।
আগুন লাগার পর হোটেলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। হোটেলের পিছনে বেরোনোর একটি পথ থাকলেও অধিকাংশ পুণ্যার্থী সেই পথ সম্পর্কে জানতেন না বলে জানা গিয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকারের মধ্যে ওই পথ খুঁজে বের করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফলে আতঙ্কিত আবাসিকদের অনেকেই সামনের রিসেপশনের দিক দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুন মূলত ওই দিকেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
আবাসিকদের একাংশের অভিযোগ, হোটেলের পিছনের দরজা বন্ধ ছিল। সেই কারণে জরুরি পরিস্থিতিতে ওই পথ দিয়ে বেরোতে গিয়ে তাঁরা সমস্যায় পড়েন। দরজা কেন বন্ধ ছিল, জরুরি নির্গমন পথ ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় ছিল কি না এবং হোটেলে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের মধ্যে মেঘালয়ের একই পরিবারের পাঁচ সদস্য থাকার খবর আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুই শিশু ছিল। জানা গিয়েছে, পরিবারটি হোটেলের একেবারে উপরের তলায় ছিল। আগুন লাগার পর শিশুদের নিয়ে একসঙ্গে নিচে নামার চেষ্টা করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু নিচে নামার সময় আগুনের মধ্যে আটকে পড়েন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত পরিবারের কাউকেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এখন তদন্তকারীদের মূল নজরে রয়েছে হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ, পিছনের দরজা বন্ধ থাকার অভিযোগ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান। পাশাপাশি হোটেল পরিচালনায় প্রবীর পাল ও তাঁর ছেলে কল্যাণ পালের ভূমিকা, প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা বিধি মানা হয়েছিল কি না এবং হোটেলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না, সেই বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রবীর পালের গ্রেপ্তারের পর তদন্ত কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে। একই সঙ্গে পুকুরে তল্লাশি চালিয়ে নিখোঁজদের বিষয়ে দ্রুত নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ।
