সংবাদ কলকাতা— জনগণনার কাজে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়োগ নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠল। এক মাসের মধ্যে জনগণনার কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি শিক্ষকদের কেন এই কাজে যুক্ত করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত। শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণ রাও জানতে চান, শিক্ষকদের বদলে বিধানসভার কর্মীদের এই কাজে নিয়োগ করা হচ্ছে না কেন।
জনগণনার কাজে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়োগ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে আদালত শিক্ষকদের উপর অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের বক্তব্য, শিক্ষার অধিকার আইনের বাস্তবায়নের উপর যখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তখন শিক্ষকদের নিয়মিত শিক্ষাদানের কাজ থেকে সরিয়ে জনগণনার মতো প্রশাসনিক কাজে নিয়োগ করার প্রয়োজনীয়তা কী, তা স্পষ্ট করা দরকার।
আদালত জানতে চায়, এই কাজের জন্য বিধানসভার কর্মীদের ব্যবহার করা যায় কি না। বিচারপতির প্রশ্ন, ‘শিক্ষকদের কেন জনগণনার কাজে নিয়োগ করছেন? শিক্ষার অধিকার আইনের ওপর আপনারা যখন এত জোর দিচ্ছেন, তাহলে শিক্ষকদের নিয়োগ করার কী দরকার? বিধানসভার কর্মীদের কেন নিয়োগ করছেন না?’
জনগণনার সময়সূচি নিয়েও কেন্দ্র ও রাজ্যের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে আদালতে প্রশ্ন ওঠে। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত জনগণনার কাজ করার নির্দেশ রয়েছে। অন্যদিকে রাজ্য সরকারের অবস্থান, স্কুলের নিয়মিত সময় শেষ হওয়ার পর শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দিয়ে জনগণনার কাজ করানো হবে। ছুটির দিনেও তাঁদের এই দায়িত্ব পালন করতে হতে পারে বলে আদালতে বিষয়টি উঠে আসে।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি কৃষ্ণ রাও। তাঁর বক্তব্য, একদিকে কেন্দ্রীয় নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে জনগণনার কাজ করার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে রাজ্য শিক্ষকদের স্কুলের নিয়মিত সময়ের পরে এই কাজে নিয়োগ করতে চাইছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে প্রশাসনিকভাবে কাজটি কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে আদালতের সংশয় প্রকাশ পায়।
শুধু শিক্ষকদের নিয়োগ নয়, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে জনগণনার কাজ শেষ করা নিয়েও আদালত প্রশ্ন তোলে। রাজ্যের তরফে এক মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা জানানো হলেও, এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বড় পরিসরের জনগণনার কাজ কীভাবে সম্পূর্ণ করা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে শুনানিতে।
ছুটির দিনেও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জনগণনার কাজে যুক্ত করার বিষয়টি নিয়েও আদালত আপত্তি ও সংশয় প্রকাশ করে। শুনানিতে বিচারপতি রাও প্রশ্ন তোলেন, ছুটির দিনে এই কাজ কীভাবে পরিচালিত হবে। কেন্দ্র ও রাজ্য, দু’পক্ষই প্রশাসনের অংশ হওয়া সত্ত্বেও কেন এমন সমন্বয়হীনতা তৈরি হচ্ছে, তা নিয়েও আদালতের পর্যবেক্ষণ সামনে আসে। এই প্রসঙ্গেই বিচারপতির মন্তব্য, ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকারে তো এই সমস্যা থাকার কথা নয়!’
এদিকে ডিজিটাল জনগণনার ক্ষেত্রে সেলফ এনুমারেশন পর্ব ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। ১৬ আগস্ট থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ের জনগণনার কাজ শুরু হয়েছে। এই পর্যায়ে গণনাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। কেন্দ্রের প্রকাশিত প্রশ্নমালায় মোট ৪০টি প্রশ্ন রাখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহের এই পর্বে নাগরিকদের একাধিক ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্য নেওয়া হবে। জাতি, ধর্ম, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা-সহ বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি কোথায় কোভিড টিকা নেওয়া হয়েছে, সেই তথ্যও সংগ্রহ করা হবে বলে জানা গিয়েছে।
ফলে একদিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জনগণনার কাজ শেষ করার প্রশাসনিক তৎপরতা, অন্যদিকে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের এই কাজে নিয়োগের সিদ্ধান্ত—দুই বিষয়ই এখন কলকাতা হাইকোর্টের নজরে। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে কাজের সময় ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে সমন্বয় কীভাবে তৈরি হয় এবং শিক্ষকদের এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে পরবর্তী শুনানিতে আরও স্পষ্টতা আসতে পারে।
