কলকাতা— নন্দীগ্রামের আন্দোলনের মাটি থেকে উঠে এসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসতে চলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ হিসেবে তাঁর শপথগ্রহণকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতন পেরিয়ে বাংলার ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছনোর এই পথচলাকে ঘিরে এখন নতুন করে আলোচনায় শুভেন্দু।
শুক্রবার নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়কদের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচিত হন শুভেন্দু অধিকারী। এরপর প্রথম বক্তব্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রণবানন্দকে শ্রদ্ধা জানান।
শুভেন্দু বলেন, ‘বাংলার মানুষ আমাকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। পাশাপাশি সেই বিজেপি কর্মীদেরও স্মরণ করছি, যাঁরা আত্মবলিদান দিয়েছেন।’
তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি কর্মীরা রাজনৈতিক হিংসা, মিথ্যা মামলা এবং অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। তাঁদের উদ্দেশে আশ্বাস দিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘‘যাঁরা ঘরছাড়া হয়েছেন, যাঁরা পরিবার হারিয়েছেন, তাঁদের স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব এখন আমাদের।’’
নতুন সরকারের কাজের ধরণ নিয়েও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তিনি। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘কথা কম, কাজ বেশি— এই নীতিতেই চলবে সরকার।’’
বিশেষ করে মহিলা নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার উপর জোর দেওয়ার কথা জানান তিনি। সন্দেশখালি এবং আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ঘটনা নিয়ে পৃথক তদন্ত কমিশন গঠনের আশ্বাসও দেন শুভেন্দু। পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নেতৃত্বে কমিশন গঠনের কথাও ঘোষণা করেন।
নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে প্রতিশ্রুতিগুলি দিয়েছিলেন, সেগুলি বাস্তবায়নে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার একসঙ্গে কাজ করবে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে আগামী দিনে বিজেপির জনসমর্থন আরও বাড়ানোর লক্ষ্যের কথাও উল্লেখ করেন।
১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁকুলিতে জন্ম শুভেন্দু অধিকারীর। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেতা এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শুভেন্দু প্রথমবার ১৯৯৫ সালে কাঁথি পুরসভা থেকে কংগ্রেসের কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হন।
পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলে সেই দলে যোগ দেন তিনি। ২০০৬ সালে কাঁথি দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হন। একই বছরে কাঁথি পুরসভার চেয়ারম্যানও হন।
তবে ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন শুভেন্দু। ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির নেতৃত্ব দিয়ে রাজ্যের রাজনীতিতে নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেন তিনি। পরে জঙ্গলমহলেও সংগঠন বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
২০০৯ সালে তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন শুভেন্দু। ২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম থেকে বিধায়ক হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় পরিবহণ মন্ত্রী হন। তবে ২০২০ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার পর জাতীয় রাজনীতিতেও বড় চর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠেন শুভেন্দু। ২০২৬ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর— দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছেন তিনি।
এবার সেই শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরেই পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বিজেপি সরকার গঠনের পথে এগোচ্ছে রাজ্য।
