দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবারে রাজ্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা পর্যালোচনা বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি-সহ প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা। রাজ্যের সমস্ত পুলিশ কমিশনারেট, জেলা পুলিশ ও থানার আধিকারিকরা ভার্চুয়ালি বৈঠকে যোগ দেন।
বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, বাংলায় আর ‘শাসকের শাসন’ চলবে না, প্রতিষ্ঠা হবে শুধুই ‘আইনের শাসন’। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের নির্দেশ দেন তিনি। প্রশাসনের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, কোনও রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনের ভিত্তিতেই চলবে ব্যবস্থা।
রাজনৈতিক হিংসায় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ, অতীতে অন্যায়ভাবে হেনস্থার শিকার ব্যক্তি এবং নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের ভুক্তভোগীদের অভিযোগ নতুন করে নথিভুক্ত করার সুযোগ দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি নির্দেশ দেন, প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ করতে হবে।
সরকারি প্রকল্পে কাটমানি, ঘুষ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি ঘোষণা করেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, ডিজিটাল বা বৈদ্যুতিন প্রমাণ পাওয়া গেলে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি মিথ্যা অভিযোগ দায়েরকারীদের বিরুদ্ধেও ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী কড়া পদক্ষেপের নির্দেশ দেন তিনি।
পুলিশ প্রশাসনে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বর্তমান ‘পুলিশ ওয়েলফেয়ার বোর্ড’ অবিলম্বে ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা করেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই বোর্ড একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠীর হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে স্বচ্ছ ও আধুনিক কল্যাণমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের কথাও জানান তিনি।
মহিলা পুলিশ কর্মীদের বদলি নীতিতেও বড় পরিবর্তনের আভাস দেন মুখ্যমন্ত্রী। দূরবর্তী জেলার বদলে সংলগ্ন জেলায় পোস্টিংয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত মহিলা কনস্টেবলদের নিজ জেলা সংলগ্ন পোস্টিং নিয়েও ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা জানান তিনি।
তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ এবং বেআইনি টোল আদায়ের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, বৈধ রসিদ ছাড়া কোনও ধরনের অর্থ আদায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সাধারণ মানুষকে সরাসরি থানায় অভিযোগ জানানোর আবেদন করা হয়েছে। পুলিশকে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
শব্দদূষণ, বেআইনি খনন, অবৈধ উত্তোলন এবং বেআইনি টোল প্লাজার বিরুদ্ধেও শূন্য সহনশীলতা নীতির কথা ঘোষণা করেন তিনি।
সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর বা পুলিশ কর্মীদের উপর হামলার ঘটনায় শুধু গ্রেপ্তার নয়, ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি সম্পত্তির আর্থিক ক্ষতিপূরণও অভিযুক্তদের থেকে আদায় করা হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী।
প্রশাসনিক বৈঠকে সরকারি আধিকারিকদের অপমান বা রাজনৈতিক ভাষণ দেওয়ার সংস্কৃতিরও তীব্র সমালোচনা করেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং আধিকারিকদের পেশাগত মর্যাদাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এছাড়াও সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য সমস্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তি বাংলা, হিন্দি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নেপালি ভাষায় প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের মানুষকে আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রশাসন থেকে ভয় দূর করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানোই এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
