ড. শুভ্র চক্রবর্তী
‘বহুত লোগ মেরি মিমিক্রি করতে হ্যায়, লেকিন শুভ্র, তুনে মুঝে জিয়া হ্যায়।’ অর্থাৎ, ‘অনেকেই আমার অনুকরণ করে, কিন্তু শুভ্র, তুই আমাকে অনুভব করেছিস।’ ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট অভিনেতা নানা পাটেকরের মুখ থেকে শোনা এই কথাগুলি আজও আমার স্মৃতিতে স্পষ্ট। একজন অভিনেতার কাছ থেকে এমন স্বীকৃতি পাওয়া আমার কাছে শুধু আনন্দের মুহূর্ত ছিল না, বরং তা ছিল এক গভীর অনুভূতি—যা আমার জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করেছে।
নানা পাটেকরের সঙ্গে আমার প্রথম স্মরণীয় সাক্ষাৎ ২০১৬ সালের ১২ নভেম্বর। ত্রিপুরার এনআইটি আগরতলার সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সেদিন আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছিল। ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি অর্জনের আনন্দের পাশাপাশি সেই অনুষ্ঠানে নানা পাটেকরের উপস্থিতি আমার কাছে ছিল বিশেষ আকর্ষণের বিষয়। তাঁকেও সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে সম্মানিত করা হয়েছিল।
এর আগের সন্ধ্যায় একটি অনুষ্ঠানে আমি নানা পাটেকরের অভিনয়শৈলী অনুকরণ করেছিলাম। তাঁর সংলাপ বলার ধরন, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, অভিব্যক্তি এবং শরীরী ভাষা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিলাম। অনুষ্ঠান শেষে তাঁর কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘শুভ্র, তু কামাল হ্যায়!’ অর্থাৎ, ‘শুভ্র, তুই অসাধারণ!’
কিন্তু পরদিন সকালে তাঁর মুখ থেকে যে কথাগুলি শুনেছিলাম, সেগুলি আমার কাছে আরও অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘বহুত লোগ মেরি মিমিক্রি করতে হ্যায়, লেকিন শুভ্র, তুনে মুঝে জিয়া হ্যায়।’ তাঁর এই কথার মধ্যে আমি শুধু একজন অভিনেতার প্রশংসা শুনিনি, শুনেছিলাম আমার প্রচেষ্টার প্রতি তাঁর আন্তরিক স্বীকৃতি। কাউকে অনুকরণ করা আর তাঁর অভিনয়ের আবেগ, চরিত্রের গভীরতা ও অনুভূতিকে নিজের মধ্যে ধারণ করা যে এক নয়, সেই উপলব্ধি আমার কাছে আরও স্পষ্ট হয়েছিল।
নানা পাটেকরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অবশ্য শুধু অভিনয় কিংবা সেই একটি স্মরণীয় মুহূর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল—সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা।
গোয়ায় গিয়ে ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর সঙ্গে কয়েক দিন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার। নানা পাটেকর ও মকরন্দ অনাসপুরে ২০১৫ সালে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। কৃষক এবং গ্রামীণ এলাকার অসহায় পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। সেখানে কাজ করতে গিয়ে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, পর্দায় শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয় করা মানুষটির বাস্তব জীবনের পরিচয়ও কতটা মানবিক হতে পারে।
আমার কাছে নানা পাটেকরের বিশেষত্ব ছিল তাঁর সরলতা এবং মানুষের দুঃখ-কষ্টের প্রতি সংবেদনশীলতা। খ্যাতি, জনপ্রিয়তা কিংবা সাফল্য তাঁকে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি। বরং নিজের সামর্থ্যকে কীভাবে অন্যের উপকারে লাগানো যায়, সেই ভাবনাই তাঁর কাজের মধ্যে বারবার ফুটে উঠেছে। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবিত করেছিল।
২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে আমার কথোপকথনের একটি মুহূর্ত আজও মনে পড়ে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, বাইরে গিয়ে যতটা সম্ভব শেখার চেষ্টা করতে, অভিজ্ঞতা অর্জন করতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের দেশে ফিরে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে। তাঁর কথার মধ্যে আমি দায়িত্ববোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা খুঁজে পেয়েছিলাম। বিদেশে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সেই জ্ঞানকে নিজের দেশের মানুষের কাজে লাগানোও সমান জরুরি।
২০২১ সালে আমি ভারতে ফিরে আসি। আমার এই সিদ্ধান্তের পিছনে একাধিক ব্যক্তিগত ও পেশাগত কারণ ছিল। তাই শুধু নানা পাটেকরের পরামর্শকেই এর একমাত্র কারণ বলা ঠিক হবে না। তবে তাঁর কথাগুলি আমার চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছিল, এ কথা আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি। নিজের অর্জিত জ্ঞানকে বৃহত্তর সামাজিক কাজে ব্যবহার করার ভাবনা আমার কাছে আরও অর্থবহ হয়ে উঠেছিল।
২০২৪ সালে পুনের ডি. ওয়াই. পাটিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনার দায়িত্বে থাকার সময় খড়কওয়াসলায় আবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সেই সাক্ষাতে আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল শিক্ষা, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান, স্বনির্ভরতা এবং সমাজের প্রতি ব্যক্তিগত দায়িত্ব। কথোপকথনের মধ্যে বারবার অনুভব করেছিলাম, তিনি শুধু সমস্যার কথা বলতে চান না; বরং কীভাবে মানুষ নিজের জায়গা থেকে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তা নিয়েও ভাবেন।
আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জন কিংবা পেশাগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হল মানুষের চিন্তাশক্তি, দক্ষতা ও দায়িত্ববোধকে বিকশিত করা। এই ভাবনা থেকেই ‘নোভার্সিটি ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে আমি ব্যবহারিক শিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং সামাজিক প্রভাব তৈরির কাজে যুক্ত থাকার চেষ্টা করছি। বিশেষ করে ত্রিপুরার তরুণ প্রজন্মের কাছে শিক্ষাকে আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নানা পাটেকরের জীবনদর্শনের কথা আমার বারবার মনে পড়ে।
তাঁর কাছ থেকে আমি শিখেছি, মানুষের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার পেশা, পরিচিতি কিংবা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষ কতটা সহমর্মী, অন্যের প্রয়োজনের সময়ে কতটা পাশে দাঁড়াতে পারেন এবং নিজের ক্ষমতাকে সমাজের কাজে কতটা ব্যবহার করেন—সেখানেই তাঁর প্রকৃত মহত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায়।
আজ নানা পাটেকরের সঙ্গে কাটানো সেই মুহূর্তগুলির দিকে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, কিছু সাক্ষাৎ মানুষের জীবনে গভীর ছাপ রেখে যায়। তাঁর বলা সেই একটি বাক্য আমার কাছে আজও বিশেষ প্রেরণার উৎস। ‘তুই আমাকে অনুভব করেছিস’—এই স্বীকৃতির মধ্যে যেন লুকিয়ে ছিল অভিনয়ের বাইরেও মানুষকে বোঝার, অনুভব করার এবং তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে শেখার এক মূল্যবান শিক্ষা।
নানা পাটেকরের সঙ্গে আমার পরিচয় তাই শুধুমাত্র একজন প্রখ্যাত অভিনেতার সঙ্গে কয়েকটি সাক্ষাতের স্মৃতি নয়। এটি আমার কাছে এক মানবিক অভিজ্ঞতা, যা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—সাফল্যের প্রকৃত অর্থ কেবল নিজের জন্য কিছু অর্জন করা নয়; বরং নিজের অর্জন, অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য দিয়ে অন্যের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা।
তাঁর কাছ থেকে পাওয়া সেই প্রশংসা, তাঁর সমাজসেবামূলক কাজের অভিজ্ঞতা এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর সঙ্গে হওয়া কথোপকথন আমার স্মৃতিতে অমূল্য হয়ে থাকবে। আমি যখনই শিক্ষা, সমাজ এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি, তখনই সেই সাক্ষাৎগুলির কথা মনে পড়ে। আর মনে পড়ে সেই বাক্যটি, যা আমার কাছে শুধু প্রশংসা নয়, বরং এক গভীর মানবিক স্বীকৃতি—‘অনেকেই আমার অনুকরণ করে, কিন্তু শুভ্র, তুই আমাকে অনুভব করেছিস।’
লেখক একজন বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও নোভার্সিটি ফাউন্ডেশন (Knowversity Foundation)-এর প্রতিষ্ঠাতা
