সংবাদ কলকাতা— আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের আর্থিক দুর্নীতি মামলায় প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে জামিন দিল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপ্রক্রিয়ার ধীর গতি এবং দীর্ঘদিন জেলবন্দি থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই নির্দেশ দিয়েছে বিচারপতি এমএম সুন্দ্রেশ ও বিচারপতি প্রশান্ত বি বরলের বেঞ্চ। তবে জামিন পাওয়ার অর্থ সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়া নয়। মামলার বিচার এখনও বাকি।
আর্থিক দুর্নীতির মামলায় জামিন চেয়ে প্রথমে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সন্দীপ। কিন্তু তাঁর আবেদন খারিজ হয়ে যায়। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন তিনি। তাঁর আইনজীবী শীর্ষ আদালতে জানান, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। মামলায় মোট ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র সাত জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পূর্ণ হয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়। এই পরিস্থিতি বিবেচনা করেই জামিন মঞ্জুর করেছে শীর্ষ আদালত।
আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসক-ছাত্রীর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পরেই হাসপাতালের আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে সন্দীপ ঘোষকে গ্রেপ্তার করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। পরে এই মামলায় তদন্ত শুরু করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটও। তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, হাসপাতালের আর্থিক লেনদেনে অনিয়ম হয়েছিল এবং ঠিকাদারদের মাধ্যমে টাকা সরিয়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছিল। এই অভিযোগগুলির সঙ্গে সন্দীপের যোগ রয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক বিষয় নয়।
এদিকে, আরজি করের চিকিৎসক-ছাত্রীর ধর্ষণ ও খুনের মূল মামলায় সন্দীপ ঘোষ আগেই জামিন পেয়েছিলেন। আর্থিক দুর্নীতির মামলায় সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশের পর তাঁর মুক্তির পথ আরও প্রশস্ত হতে পারে। তবে জামিনের শর্ত এবং অন্য কোনও মামলায় আটক থাকার বিষয় থাকলে তা-ও মুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সন্দীপ ঘোষের জামিনের খবরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নির্যাতিতার বাবা। সিবিআইয়ের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘সিবিআই অপদার্থ সংস্থা। সেটা আরও এক বার প্রমাণ হল।’ তাঁর বক্তব্য, বিচার না পেলে এই অসন্তোষ প্রকাশ করা ছাড়া আর কোনও পথ থাকবে না।
আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম মুখ অনিকেত মাহাতোও সিবিআইয়ের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং দুর্নীতি ও হুমকি-সংস্কৃতির শিকড়ে পৌঁছতে না পারার কারণে ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক দেবাশিস হালদারও সন্দীপের জামিনকে সিবিআইয়ের তদন্তের ব্যর্থতা বলে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এই জামিন অপ্রত্যাশিত হলেও আশ্চর্যজনক নয়।
ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকী অবশ্য মনে করিয়ে দিয়েছেন, জামিন মানেই নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া নয়। তাঁর আশঙ্কা, সন্দীপ ঘোষের সরকারি চাকরিতে পুনর্বহাল বা মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার বদলালেও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্নীতি ও কথিত হুমকি-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা বদলাবে।
অ্যাসোসিয়েশন অফ হেল্থ সার্ভিস ডক্টর্সের সম্পাদক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়ও দ্রুত বিচার শেষ করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র সাত জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পূর্ণ হওয়া বিচারপ্রক্রিয়ার গতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। অন্য দিকে, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক তাপস ফ্রান্সিস বিশ্বাসও সন্দীপের জামিন নিয়ে কটাক্ষ করেছেন।
সন্দীপ ঘোষের জামিন নিয়ে আইনি প্রশ্নের পাশাপাশি নতুন করে সামনে এসেছে নির্যাতিতার পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবি। তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের মূল ভিত্তি ছিল দীর্ঘ বন্দিদশা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ধীর গতি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব এখনও আদালতেরই।
previous post
