September 17, 2026
রাজ্য

চার দশক পরে পটাশপুরে ধরা পড়লেন মাওবাদী নেতা আকাশ

উদ্ধার নথি ও বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম

নিজস্ব সংবাদদাতা, পূর্ব মেদিনীপুর— প্রায় চার দশক ধরে মাওবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ থাকা অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশ, তিমির ও মনোজকে গ্রেপ্তার করেছে কলকাতা পুলিশের টাস্ক ফোর্স (Kolkata Police STF)। পুলিশ সূত্রের দাবি, পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর (Patashpur) এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার ভোরে তাঁকে ধরা হয়। দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা এই মাওবাদী নেতার মাথার দাম এক কোটি টাকা ছিল বলে জানা গিয়েছে।

গ্রেপ্তারের সময় অসীমের কাছ থেকে দুটি ব্যাগ পাওয়া যায়। সেগুলির মধ্যে মাওবাদী সংগঠনের বই, প্রচারপত্র এবং বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম (Electronic Devices) ছিল বলে তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে। উদ্ধার হওয়া সামগ্রী পরীক্ষা করে তাঁর সাম্প্রতিক যোগাযোগ এবং সংগঠনের কার্যকলাপ সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।

পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা থানার ফুলচকের বাসিন্দা অসীম আশির দশকে ছাত্রজীবন থেকেই অতি বামপন্থী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত হন বলে পুলিশ সূত্রে দাবি। পরে পিপলস ওয়ার গ্রুপের (People’s War Group) সদস্য হন। সারেঙ্গা, গোয়ালতোড় এবং তৎকালীন ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূমের গুড়াবান্দা এলাকায় দীর্ঘদিন সংগঠনের কাজ করেছিলেন তিনি।

২০০৪ সালে সিপিআই মাওবাদী (CPI Maoist) গঠিত হওয়ার পর জঙ্গলমহলে ফিরে সংগঠনের কাজে সক্রিয় হন অসীম। লালগড় আন্দোলনের (Lalgarh Movement) সময়ও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে পুলিশের দাবি। ২০১০ সালে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক করা হয়েছিল বলে জানা যায়। বাংলা, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা নিয়ে গঠিত আঞ্চলিক কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তাঁর হাতে ছিল।

কিন্তু মাওবাদী নেতা কিষানজি (Kishenji) নিহত হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে সংগঠনের কার্যকলাপ ধাক্কা খায়। অসীমও ধীরে ধীরে জঙ্গলমহল ছেড়ে ঝাড়খণ্ডে আত্মগোপন করেন। প্রায় ১৫ বছর পর তিনি ফের এলাকায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে পুলিশের দাবি।

এর মধ্যেই ঝাড়খণ্ডে মাওবাদী সংগঠনের একাধিক সদস্য পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। কয়েক জন আত্মসমর্পণও করেন। এর পর সংগঠনের সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়ে বলে তদন্তকারী সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

অসীমের বয়স এখন ৬৪ বছর। দীর্ঘদিন জঙ্গলে থাকার কারণে তাঁর শারীরিক সমস্যাও দেখা দিয়েছিল বলে ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি। উচ্চ রক্তচাপ এবং কোমরের ব্যথার কারণে গত আগস্টে তিনি জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন বলে জানা গিয়েছে। একটি একে-৪৭ (AK-47) এবং কিছু নথি জঙ্গলে রেখে যাওয়ার কথাও তদন্তে উঠে এসেছে বলে পুলিশ সূত্রের দাবি।

এর পর শচিন, মিতা ও জবার মতো কয়েক জন মাওবাদী সদস্য পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, অসীম আত্মসমর্পণ করতে চাননি। পরিস্থিতি শান্ত হলে ফের জঙ্গলমহলে ফিরে আসার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। তাঁর দেহরক্ষী মঙ্গল এবং স্ত্রী মালতী এখনও জঙ্গলে রয়েছেন বলে ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গ্রেপ্তারের আগে অসীমের কাছে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা নগদ ছিল। আত্মীয় ও পরিচিতদের সাহায্যে আত্মগোপন করার পরিকল্পনাও করেছিলেন তিনি। কিন্তু পুলিশের নজর এড়াতে বার বার জায়গা বদল করছিলেন এবং ছদ্মবেশে চলাফেরা করছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি।

অসীমের স্ত্রীও মাওবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পটাশপুরের বাসিন্দা ওই মহিলাকে ২০১০ সালে কলকাতা পুলিশের টাস্ক ফোর্স গ্রেপ্তার করেছিল। বর্তমানে তিনি জেলে রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে পলাতক থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ মাওবাদী নেতার গ্রেপ্তারির পর এখন তাঁর কাছ থেকে পাওয়া নথি ও বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম ঘিরে তদন্ত শুরু হয়েছে। তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ রাখতেন, কোথা থেকে অর্থ আসত এবং জঙ্গলমহলে ফের সংগঠন সক্রিয় করার কোনও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল কি না, সেই বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রের খবর।

Related posts

Leave a Comment