সংবাদ কলকাতা: কলকাতা পুরসভার কোষাগার থেকে কর্মীদের বেতন, ভাতা ও মজুরি বাবদ প্রতি মাসে নির্ধারিত হিসাবের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মীর সংখ্যা অনুযায়ী যতটা অর্থ খরচ হওয়ার কথা, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি টাকা কোষাগার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে একটি হিসাব সামনে এসেছে। কর্মীসংখ্যা এবং বেতন-মজুরির খরচের মধ্যে এই গরমিলের কারণ কী, তা খুঁজে বের করতেই তদন্ত শুরু হয়েছে।
সূত্রের খবর, কলকাতা পুরসভার বিশেষ কমিশনার সৌম্য ভট্টাচার্য পাঁচ সদস্যের এই কমিটি গঠন করেছেন। কলকাতা পুরসভার কমিশনার তথা প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডের নির্দেশের পরেই তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পুরসভার বিভিন্ন দপ্তর থেকে কর্মীদের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে তা যাচাই করছেন কমিটির সদস্যরা।

তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড অফিস, বরো অফিস, বিভিন্ন বিভাগীয় দপ্তর, পুরসভার অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান এবং মূল ভবনের কর্মীদের তথ্য। কোন দপ্তরে কতজন স্থায়ী কর্মী রয়েছেন, কতজন অস্থায়ী কর্মী কাজ করছেন, কতজন চুক্তিভিত্তিক কর্মী রয়েছেন এবং কতজন কর্মী বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে নিযুক্ত হয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে কর্মরত কর্মীদের তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
শুধু নথিতে থাকা কর্মীর সংখ্যা যাচাই করেই তদন্ত শেষ করতে চাইছে না কমিটি। বাস্তবে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা নিয়মিত কাজে আসেন কি না, তাঁরা কত দিন কাজ করেন এবং উপস্থিতি নথিতে নাম থাকা সত্ত্বেও কেউ অনুপস্থিত থাকেন কি না, সেই বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখা হবে। কর্মীদের জৈবিক উপস্থিতি নথিও পরীক্ষা করা হবে বলে জানা গিয়েছে।
রা মাসিক বেতন পান, কারা দৈনিক মজুরি পান এবং কারা বিভিন্ন ধরনের ভাতা পান, সেই তথ্যও পৃথকভাবে যাচাই করা হচ্ছে। পুরসভার কাছে থাকা কর্মীসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে বেতন ও মজুরি বাবদ কোষাগার থেকে বেরিয়ে যাওয়া অর্থের হিসাব মিলিয়ে দেখা হবে। এর ফলে কোথায় এবং কী কারণে আর্থিক গরমিল তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, কলকাতা পুরসভায় স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা ১৩ হাজার ৯০০-র কিছু বেশি। অস্থায়ী কর্মীর সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার। এর মধ্যে সরাসরি চুক্তিভিত্তিক কর্মী এবং বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে নিযুক্ত কর্মীরা রয়েছেন। তবে শহরের একশো দিনের কাজ প্রকল্পের কর্মীদের এই তদন্তের আওতায় রাখা হচ্ছে না বলে সূত্রের খবর।
কিছু দিন আগে পুরসভার হিসাব পরীক্ষা করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের নজরে আসে, অস্থায়ী কর্মীদের কাজের ভিত্তিতে যে পরিমাণ বেতন বা মজুরি দেওয়ার কথা, তার তুলনায় বেশি অর্থ কোষাগার থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এরপরই বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিতভাবে হিসাব পরীক্ষা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে কর্মী সরবরাহকারী সংস্থাগুলির মাধ্যমে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনও গরমিল রয়েছে কি না, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুরসভায় দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী নিয়োগের সুযোগ সীমিত থাকায় চুক্তিভিত্তিক এবং সংস্থার মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের উপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে কোন সংস্থার মাধ্যমে কতজন কর্মী নিযুক্ত হয়েছেন, তাঁদের জন্য কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে এবং বাস্তবে সেই অনুযায়ী কর্মী কাজ করছেন কি না, তদন্তে সেই বিষয়গুলির উপর বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
পুরসভার অন্দরেও এই তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। সমস্ত নথি, উপস্থিতির তথ্য এবং আর্থিক হিসাব যাচাই করার পরেই গরমিলের প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব হবে।
তদন্ত শেষ হলে কলকাতা পুরসভার স্থায়ী, অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের একটি হালনাগাদ তালিকাও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কর্মীদের বেতন, মজুরি ও ভাতা বাবদ পুরসভার কোষাগার থেকে প্রকৃতপক্ষে কত অর্থ খরচ হচ্ছে, তারও একটি পরিষ্কার ছবি সামনে আসবে। আর্থিক গরমিলের উৎস কোথায়, সেই প্রশ্নের উত্তরও তদন্তের রিপোর্টেই মিলবে বলে পুরসভা সূত্রে খবর।
