নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে প্রবাসী ভারতীয়দের এক বৃহৎ সমাবেশে ভারত-নিউজিল্যান্ড সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সনের উপস্থিতিতে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে মোদী বলেন, সদ্য স্বাক্ষরিত ভারত-নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) শুধু দুই দেশের বাণিজ্যই নয়, মহাকাশ প্রযুক্তি, ক্রীড়া, উদ্ভাবন এবং কৌশলগত সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
হাজার হাজার প্রবাসী ভারতীয়কে উদ্দেশ করে দেওয়া ভাষণে মোদী বলেন, ভারত ও নিউজিল্যান্ডের সম্পর্কের ভিত্তি হল অভিন্ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানুষের সঙ্গে মানুষের গভীর যোগাযোগ এবং ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারিত্ব। তাঁর মতে, এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভারতের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার যাত্রাকে আরও গতিশীল করবে এবং একই সঙ্গে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
মোদী বলেন, ‘ভারত-নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আমাদের উন্নত ভারতের লক্ষ্যপূরণের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। এর ফলে ভারত ও নিউজিল্যান্ড—দুই দেশেই ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।’
মহাকাশ গবেষণার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ভারতের চন্দ্রযান অভিযানের সফল অবতরণে নিউজিল্যান্ডের প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি জানান, নিউজিল্যান্ডের মহাকাশ প্রযুক্তি সংস্থাগুলি অতীতেও ভারতের সঙ্গে একাধিক প্রকল্পে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মোদীর কথায়, ‘যখন ভারতের চন্দ্রযান চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করেছিল, তখন গোটা নিউজিল্যান্ডও সেই সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করেছিল। নিউজিল্যান্ডের প্রযুক্তিও এই সাফল্যের অংশ ছিল। মহাকাশ গবেষণায় দুই দেশের সহযোগিতা আমরা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’
ক্রীড়া সহযোগিতার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাগবি খেলায় নিউজিল্যান্ডের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সাফল্য থেকে ভারত শিক্ষা নিতে আগ্রহী। এজন্য নিউজিল্যান্ডের কোচ, বিশেষজ্ঞ এবং প্রশিক্ষকদের সহায়তা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মোদী বলেন, ‘ভারত রাগবির ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের কাছ থেকে শিখতে চায়। এই খেলার উন্নয়নে আমাদের কোচ ও বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। নিউজিল্যান্ড এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করতে পারে।’
তিনি জানান, সম্প্রতি ভুবনেশ্বরে নিউজিল্যান্ড রাগবি এবং রাগবি ইন্ডিয়ার যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ইতিবাচক সূচনা করেছে। ভবিষ্যতে স্পোর্টস টেকনোলজির ক্ষেত্রেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দুই দেশের দীর্ঘ ক্রীড়া সম্পর্কের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন মোদী। তিনি বলেন, চলতি বছর ভারত ও নিউজিল্যান্ডের ক্রীড়া সম্পর্কের ১০০ বছর পূর্তি হচ্ছে। এক শতাব্দী আগে ভারতীয় হকি দল নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়েছিল এবং সেই সফরে মেজর ধ্যানচাঁদের অসাধারণ নৈপুণ্য স্থানীয় মানুষের মন জয় করেছিল।
তিনি বলেন, ‘এখন সহযোগিতার যুগ। ক্রীড়াক্ষেত্রেও ভারত ও নিউজিল্যান্ড একসঙ্গে অনেক বড় সাফল্য অর্জন করতে পারে।’
প্রবাসী ভারতীয়দের ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এয়ার নিউজিল্যান্ডের প্রধান নির্বাহী নিখিল রবীশঙ্কর, নিউজিল্যান্ডের প্রাক্তন গভর্নর-জেনারেল আনন্দ সত্যনন্দ এবং ক্রিকেটার রাচিন রবীন্দ্র, ইশ সোধি ও আজাজ প্যাটেলের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
এছাড়া নিউজিল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানের নামের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক যোগসূত্রের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বম্বে হিলস, কোরোম্যান্ডেল, কলকাতা স্ট্রিট, দিল্লি ক্রিসেন্ট, অমৃতসর স্ট্রিট এবং খান্ডালা-সহ একাধিক স্থানের নাম উল্লেখ করে মোদী বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক শুধু কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইতিহাস, স্মৃতি, বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে।
মাওরি ভাষার ‘ওয়াকা’ শব্দের উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি একসঙ্গে পথচলার প্রতীক। তাঁর ভাষায়, ‘আজ ভারত-নিউজিল্যান্ডের ‘ওয়াকা’ নতুন এক যাত্রার জন্য প্রস্তুত। আমাদের সামনে অসংখ্য সম্ভাবনা রয়েছে এবং সময়ও আমাদের পক্ষে রয়েছে।’
প্রায় তিন দশক আগে, রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগেই নিউজিল্যান্ড সফরের স্মৃতিচারণও করেন মোদী। তিনি জানান, সেই সফরে এক স্থানীয় বাসিন্দা তাঁকে একটি মাফলার, টুপি ও দস্তানা উপহার দিয়েছিলেন। আজও তিনি সেই উপহার যত্ন করে সংরক্ষণ করে রেখেছেন।
মোদী বলেন, ‘আপনারা যে মাফলাটি দেখছেন, সেটি প্রায় ২৫-৩০ বছর আগে এক নিউজিল্যান্ডবাসী আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। বহুবার এটি ব্যবহার করেছি। আজও যেমন এটি যত্নে রেখেছি, তেমনই আপনাদের ভালোবাসাকেও হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছি।’
তিনি নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন, সে দেশের সরকারের সদস্য এবং লেবার পার্টির প্রতিনিধিদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য ধন্যবাদ জানান। তাঁর মতে, এটি ভারত-নিউজিল্যান্ড সম্পর্কের প্রতি নিউজিল্যান্ডের সর্বদলীয় সমর্থনের প্রতিফলন।
মোদী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি হয়তো আমার প্রথম নিউজিল্যান্ড সফর। প্রায় ৪০ বছর পর কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নিউজিল্যান্ডে এসেছেন। ১৪০ কোটি ভারতীয়ের শুভেচ্ছা আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই যাত্রার সাফল্য নিয়ে আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তা আমার কারণে নয়, বরং আপনারাই এই যাত্রার প্রকৃত পথপ্রদর্শক।’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন নরেন্দ্র মোদীকে ‘আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা’ এবং ‘নিউজিল্যান্ডের প্রকৃত বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেন।
লাক্সন বলেন, ‘সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে তিনি বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর নেতৃত্বে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছেন।’
নবস্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে নিউজিল্যান্ডের রপ্তানিকারকদের জন্য ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের বিশাল ভারতীয় বাজার উন্মুক্ত হবে। একই সঙ্গে নিউজিল্যান্ডে ব্যবসা পরিচালনাকারী ভারতীয় সংস্থাগুলির জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
লাক্সনের কথায়, ‘ভারত শুধু এমন একটি দেশ নয় যার সঙ্গে আমরা বাণিজ্য করি। ভারত এমন একটি অংশীদার, যার সঙ্গে আমরা একসঙ্গে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা ভারতের ওপর আস্থা রাখি।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই মনে করতেন ভারত-নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্ভব নয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং আমি সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা এই ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন করতে পেরেছি।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে নরেন্দ্র মোদীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান উপস্থিত প্রবাসী ভারতীয়রা। ‘মোদী, মোদী’ এবং ‘ভারত মাতা কি জয়’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। ভারতীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও পরিবেশন করেন। দুই দেশের শতবর্ষের ক্রীড়া সম্পর্ককে স্মরণীয় করে রাখতে মোদী ও লাক্সনের হাতে তাঁদের নাম এবং ‘১০০’ নম্বর খচিত বিশেষ স্মারক জার্সিও তুলে দেওয়া হয়।
