সংবাদ কলকাতা, ২০ জুন: আজ ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজ্য জুড়ে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছেন, আবার কেউ প্রশ্ন তুলছেন দিনটির তাৎপর্য নিয়ে। তবে সেই বিতর্কের বাইরে গিয়ে ১৯৪৭ সালের ২০ জুন অবিভক্ত বঙ্গের আইনসভায় ঠিক কী ঘটেছিল, তার দিকে নজর দিলে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সামনে আসে।
এ বিষয়ে ‘বর্তমান’ কাগজের সিনিয়র সাংবাদিক কৌশিক ঘোষ সামাজিক মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন, রাজ্য বিধানসভা থেকে ২০০২ সালে প্রকাশিত একটি পুস্তিকায় ওই দিনের আইনসভার বিস্তারিত কার্যবিবরণী প্রকাশিত হয়েছিল। সেই নথি অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন অবিভক্ত বঙ্গের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একাধিক দফায় ভোটাভুটি হয়েছিল। মূল প্রশ্ন ছিল, বাংলা বিভক্ত হবে কি না।
তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের ৩ জুন ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ভোটাভুটি পরিচালিত হয়। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, অবিভক্ত বাংলার আইনসভার সদস্যরা একসঙ্গে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি মুসলিম প্রধান এলাকা ও অ-মুসলিম প্রধান এলাকার প্রতিনিধিরা পৃথকভাবেও মত প্রকাশ করবেন। এই প্রক্রিয়া থেকে ইউরোপীয় সদস্যদের বাইরে রাখা হয়েছিল।
মুসলিম প্রধান এলাকার মধ্যে ছিল মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং নদীয়ার কিছু অংশ। অন্যদিকে, অ-মুসলিম প্রধান এলাকার মধ্যে ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ অঞ্চল, পাশাপাশি খুলনা ও সাতক্ষীরার কিছু অংশ।
আইনসভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, প্রথমে মুসলিম প্রধান এলাকার প্রতিনিধিরা ভোটাভুটিতে অংশ নেন। সেখানে বাংলা বিভাগের বিরুদ্ধে স্পষ্ট মত প্রকাশ করা হয়। মোট ১০৬ জন সদস্য বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেন। অর্থাৎ তাঁরা চান, গোটা বাংলায় বিভাজিত পাকিস্তানের মধ্যে থাকুক। বিপরীতে বাংলা ভাগের পক্ষে ভোট দেন ৩৫ জন সদস্য। অর্থাৎ তাঁরা চেয়েছিলেন হিন্দু প্রধান এলাকা অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের মধ্যে থাকুক এবং মুসলিম প্রধান এলাকা অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের মধ্যে থাকুক।
এরপর অ-মুসলিম প্রধান এলাকার প্রতিনিধিদের ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। মোট ৫৮ জন সদস্য বাংলা ভাগের পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে, ২১ জন সদস্য বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেন। অর্থাৎ বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ প্রতিনিধিরা চেয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ পাকিস্তানের মধ্যে না গিয়ে ভারতের মধ্যেই থাকুক। যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ ভারতের মধ্যে থাকবে কিনা এটাই মূল সমস্যা, তাই সেখানকার সিংহভাগ জনপ্রতিনিধি ঠিক কী চাইছেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ বিষয়ে পূর্ববঙ্গের অর্থাৎ মুসলিম প্রধান এলাকার সিংহভাগ প্রতিনিধি কী চাইছেন, সেটা প্রাধান্য পায়নি। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের সঙ্গে থাকবে, নাকি পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হবে, তা এখানকার সিংহভাগ জনপ্রতিনিধিদের মতামতই গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং এই ভোটাভুটির ফলাফল পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। পরবর্তীকালে জুলাই মাসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারত স্বাধীনতা আইন গৃহীত হয় এবং তার ভিত্তিতেই দেশভাগ ও বাংলা বিভাগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়।
কার্যবিবরণী থেকে আরও জানা যায়, অ-মুসলিম প্রধান এলাকার প্রতিনিধিদের মধ্যে নানা রাজনৈতিক মতাদর্শের হিন্দু নেতারা বাংলা ভাগের পক্ষে একমত হয়েছিলেন। আইনসভায় সে সময় কমিউনিস্ট পার্টির তিনজন সদস্য ছিলেন। তাঁদের মধ্যে জ্যোতি বসু রেল শ্রমিক কেন্দ্র থেকে এবং রতন লাল ব্রাহ্মণ দার্জিলিং শ্রমিক কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রতিনিধি ছিলেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা হেমন্ত কুমার বসুও আইনসভার সদস্য ছিলেন। স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী হওয়া যাদবেন্দ্র পাঁজা ও হেমচন্দ্র নস্করের মতো নেতারাও ওই আইনসভার সদস্য ছিলেন। কার্যবিবরণী অনুযায়ী, এঁরা সকলেই বাংলা ভাগের পক্ষে ভোট দেন।
অন্যদিকে, মুসলিম প্রধান এলাকার প্রতিনিধিদের ভোটাভুটিতে বাংলা ভাগের পক্ষে মত দেন কংগ্রেস নেতা কিরণশঙ্কর রায় এবং মতুয়া সমাজের বিশিষ্ট নেতা প্রমথরঞ্জন ঠাকুর। অবিভক্ত বাংলার দিনাজপুর থেকে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সদস্য রূপনারায়ণ রায়ের ভোটদানের বিষয়ে কার্যবিবরণীতে কোনও স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। ফলে ইতিহাসবিদদের একাংশের ধারণা, তিনি হয়তো ভোটাভুটিতে অংশ নেননি বা আসতে পারেননি।
এই ভোটাভুটির তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, হিন্দু প্রধান (অ-মুসলিম) এলাকার যে প্রতিনিধিরা বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরা সবাই ছিলেন মুসলিম। অর্থাৎ তাঁরা চেয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হোক। আবার মুসলিম প্রধান এলাকার যে প্রতিনিধিরা বাংলা ভাগের পক্ষে মত দিয়েছিলেন, তাঁরা সবাই ছিলেন হিন্দু। অর্থাৎ তাঁরা চেয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ ভারতের মধ্যে থাকুক। তবে বাংলা ভাগ করার প্রশ্নটিতে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট, হিন্দু মহাসভা থেকে নেতাজি সঙ্গী-সহ সব হিন্দু নেতাই ওইদিন একজোট হয়ে গিয়েছিলেন আইনসভাতে।
ইতিহাসের এই অধ্যায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে। বাংলা বিভাগের প্রশ্নে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি, হিন্দু মহাসভা এবং নেতাজি-ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের একাংশ একই অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালের ২০ জুনের আইনসভা অধিবেশন তাই শুধু একটি ভোটাভুটি নয়, বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।
