সেনা-নৌসেনা ও রেলের তথ্য পাচারের অভিযোগ
হাবড়া: স্বাধীনতা দিবসের আগে উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া থেকে সন্দেহভাজন পাকিস্তানি গুপ্তচরকে গ্রেপ্তার করল রাজ্য পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী বাহিনী। ধৃতের নাম রানা রউফ ওরফে ওয়াহাব আলম। তদন্তকারীদের দাবি, পাকিস্তানের ফয়সলাবাদের বাসিন্দা রানা দীর্ঘদিন ধরে ভারতে থেকে সেনা, নৌসেনা এবং রেল সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থার কাছে পাঠাতেন। বুধবার তাঁকে বারাসত আদালতে হাজির করানো হলে বিচারক ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক দাবি, পাকিস্তান থেকে সরাসরি ভারতে ঢোকার আগে দীর্ঘ সময় নেপালে ছিলেন রানা। ২০১২ সালের দিকে তিনি ভারতে প্রবেশ করেন বলে অনুমান তদন্তকারীদের। পরে পশ্চিমবঙ্গে এসে ভুয়ো পরিচয়ে বসবাস শুরু করেন বলে অভিযোগ। তদন্তে উঠে এসেছে, ‘ওয়াহাব আলম’ নামে পরিচয় ব্যবহার করে আধার কার্ড-সহ একাধিক ভারতীয় নথি তৈরি করেছিলেন তিনি। ওই নথিগুলিতে কলকাতার তপসিয়ার ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
হাবড়া থেকে গ্রেপ্তারের সময় রানার গতিবিধি নিয়েও তদন্তকারীরা তথ্য সংগ্রহ করছেন। সূত্রের খবর, কলকাতা থেকে বনগাঁ সীমান্তের দিকে যাওয়ার সময় গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাবড়ার যশোর রোড এলাকায় তাঁকে আটক করা হয়। সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় তাঁর উপস্থিতির কারণ কী ছিল, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ তদন্তকারী বাহিনীর দাবি, ভারতে থাকার সময় রানা দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতেন। ভারতীয় সেনা ও নৌসেনার পাশাপাশি রেল ব্যবস্থার গতিবিধি সম্পর্কেও তিনি তথ্য সংগ্রহ করেছেন বলে অভিযোগ। সেই তথ্য কী ভাবে সংগ্রহ করা হত, কার মাধ্যমে পাঠানো হত এবং পাকিস্তানে ঠিক কোথায় তা পৌঁছত, তা জানার চেষ্টা চলছে।
স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগে এই গ্রেপ্তারিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ১৫ আগস্টকে সামনে রেখে কোনও নাশকতার পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও হামলার পরিকল্পনার প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। তদন্তের মাধ্যমে সেই বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা চলছে।
রানাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কলকাতার তপসিয়া থেকে আরও এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, কলকাতায় এলে রানা তপসিয়াতেই থাকতেন। সেই সূত্রে ওই ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় বলে প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে। রানার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং কথাবার্তার ধরন খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
তবে তপসিয়া থেকে ধৃত দ্বিতীয় ব্যক্তির কোনও জঙ্গি সংগঠন বা গুপ্তচরচক্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য পেতে তাঁকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, রানা একা কাজ করতেন নাকি তাঁর আরও সহযোগী রয়েছে, তা জানতে এই জিজ্ঞাসাবাদ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এর আগে রাজ্যে পাকিস্তানি গুপ্তচরচক্রের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। সেই প্রেক্ষাপটে রানার গ্রেপ্তারির পর তাঁর নথি, যোগাযোগ, যাতায়াত এবং আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, ভারতে থাকার দীর্ঘ সময়ে তিনি আর কার কার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন।
রানার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের গুরুত্বের কারণে তাঁর পুলিশি হেফাজতের সময়কে কাজে লাগিয়ে বিস্তারিত জেরা চালানো হবে বলে তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে। বিশেষ করে সেনা, নৌসেনা ও রেল সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের অভিযোগের সত্যতা এবং সেই তথ্য পাচারের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
স্বাধীনতা দিবসের আগে হাবড়া থেকে এই গ্রেপ্তারির ঘটনায় উত্তর ২৪ পরগনা ও কলকাতার নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও নজর বেড়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত রানা সত্যিই গুপ্তচরচক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পূর্ণ পরিধি কতটা, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
