নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা— দুর্গাপুজোর সরকারি অনুদান দেওয়ার নিয়মে বদল ঘিরে সমস্যায় পড়েছে রাজ্যের কয়েক হাজার পুজো কমিটি। এ বার পুজোর অনুমতির আবেদনের পাশাপাশি সরকারি অনুদানের জন্যও আবেদন করতে হচ্ছে কমিটিগুলিকে। সেই আবেদনের সঙ্গে পুজো কমিটির নিজস্ব প্যান কার্ড এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্দিষ্ট তথ্য না থাকলে অনুদানের প্রক্রিয়ায় থানার তরফে সহযোগিতা করা সম্ভব নয় বলে বিভিন্ন পুজো কমিটিকে জানানো হচ্ছে। নতুন নিয়মে বিশেষ করে শহরতলি ও গ্রামাঞ্চলের সেই সব পুজো কমিটি সমস্যায় পড়েছে, যাদের এত দিন নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল না।
গত বছর পর্যন্ত অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা ছিল। পুজো কমিটির নিজস্ব রেজিস্ট্রেশন বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট না থাকলে কমিটির কোনও পদাধিকারীর প্যান নম্বর এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য দিয়েও অনুদান নেওয়ার সুযোগ ছিল। সেই পদাধিকারীর নামে স্থানীয় থানার মাধ্যমে চেক দেওয়া হত। এ বার সেই ব্যবস্থা বদলে অনুদানের টাকা সরাসরি সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটির নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে কোনও পদাধিকারীর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে সরকারি অনুদান পাঠানোর সুযোগ থাকছে না।
মহেশতলা বিধানসভা এলাকার বেগরখাল জোড়াবেড়ি সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা তৈরি হয়েছে। প্রায় ১৫ বছর ধরে পুজো করে আসা এই কমিটি সরকারি অনুদানের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। গত বছর পর্যন্ত কমিটির সভাপতি প্রভাত চক্রবর্তীর প্যান নম্বর ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য দিয়েই অনুদান পেয়েছিল তারা। কিন্তু এ বার পুজোর অনুমতির জন্য আবেদন করতে গিয়ে মহেশতলা থানার কাছ থেকে নতুন নিয়মের কথা জানতে পারে কমিটি।
এর পরেই পুজো কমিটির নামে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় রেজিস্ট্রেশনের কাগজপত্র তৈরি করে প্যান কার্ড ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য হাতে থাকা সময় যথেষ্ট নয় বলে কমিটির সদস্যেরা জানতে পারেন। মহেশতলা এলাকার জিঞ্জিরা বাজারের একটি পুজো কমিটির ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
বেগরখাল জোড়াবেড়ি সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির সভাপতি প্রভাত চক্রবর্তী বলেন, ‘আমাদের পুজো পুরোপুরি সরকারি অনুদানের উপর নির্ভরশীল। পুজোর অনুমতির জন্য আবেদন করতে গিয়ে নতুন নিয়মের কথা জানতে পেরেছি। এত অল্প সময়ে রেজিস্ট্রেশন এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। মুখ্যমন্ত্রীর অনুদান ঘোষণার সময় এই শর্তের কথা জানানো হয়নি। ফলে এখন আমাদের শাঁখের করাতের মতো অবস্থা।’
তবে আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতার প্রশ্নে সরকারের এই নতুন নিয়মকে সমর্থন করেছেন ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের সভাপতি সন্দীপন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, দুর্গাপুজোর মতো বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকারি অনুদান বা বিজ্ঞাপনের টাকা কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে নেওয়া উচিত নয়। পুজো কমিটির নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকা প্রয়োজন বলেই তাঁর মত।
পশ্চিমবঙ্গ দুর্গাপুজো সমন্বয় সমিতির উপদেষ্টা প্রতীম সরকারও একই মত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অধিকাংশ দুর্গাপুজো ক্লাব বা সংগঠনের উদ্যোগে হয়। তাই সংগঠনের নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এত দিন কোনও ব্যক্তির অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা নেওয়া হয়ে থাকলে সেই ব্যবস্থার বদলে সংশ্লিষ্ট

সংগঠনের নামে রেজিস্ট্রেশন এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট তৈরি করা উচিত বলে তাঁর মত।
অন্য দিকে, বেহালার ডায়মন্ড ক্লাবের সমস্যা আরও জটিল। পুজোর অনুদান তো দূরের কথা, পুজোর অনুমতি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে কমিটির এক সদস্যের দাবি। বেহালা থানার পাশের একটি গলিতে প্রায় ৬৮ বছর ধরে এই পুজো হয়ে আসছে। কমিটির অন্যতম সদস্য মুকুলেশ দাম অভিযোগ করেন, আগের সরকারের সময়ে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাঁদের পুজোর অনুমতি পেতে সমস্যা হত। সেই কারণে সরকারি অনুদান থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে তাঁর দাবি।
মুকুলেশের দাবি, গত বছর বিষয়টি তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে জানানো হয়েছিল। তাঁর কথায়, সেই সময় শুভেন্দুর তরফে তাঁর তৎকালীন আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মাধ্যমে তাঁদের আর্থিক সাহায্য করা হয়েছিল এবং সরকার বদল হলে পুজোর অনুমতি ও অনুদান দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। তবে চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যুর পর এ বার নতুন পরিস্থিতিতে তাঁরা অনুদান পাবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন মুকুলেশ।
গত ৭ সেপ্টেম্বর দুর্গাপুজো কমিটিগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে এ বছরের সরকারি অনুদানের কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ছোট ও কম বাজেটের পুজো কমিটিগুলির জন্য এক লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে পুজো কমিটিগুলিকে বিদ্যুৎ বিলে ১০০ শতাংশ ছাড় এবং দমকলের ছাড়পত্রের ফি মকুবের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। বড় বাজেটের পুজো কমিটিগুলিকে অবশ্য সরকারি অনুদান না নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
ইতিমধ্যে কলকাতার একাধিক বড় পুজো কমিটি সরকারি অনুদান না নেওয়ার কথা জানিয়েছে। সরকারি সহায়তা নিতে ইচ্ছুক কমিটিগুলিকে সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে আবেদন করতে হবে এবং সেই আবেদন যাচাইয়ের পর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় পাঠানো হবে।

নতুন নিয়ম নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যেই এ বার অনুদানের অঙ্কও গত বছরের তুলনায় কমেছে। ২০২৫ সালে রাজ্যের ৪৫,৩৩৬টি দুর্গাপুজো কমিটিকে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়েছিল। এ বার ছোট ও কম বাজেটের পুজোর জন্য অনুদানের অঙ্ক ১ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। ২০২৪ সালে অনুদানের অঙ্ক ছিল ৮৫ হাজার টাকা।ফলে এক দিকে অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও প্রয়োজনের উপর জোর, অন্য দিকে কমিটির নি
ড়েছে বেশ কিছু পুজো কমিটি। পুজোর সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই দ্রুত এই নথিপত্র তৈরি করে নতুন নিয়ম মেনে অনুদানের আবেদন কী ভাবে সম্পূর্ণ হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে কমিটিগুলির মধ্যে। নবান্ন সূত্রে অবশ্য জানা গিয়েছে, আপাতত এই নিয়ম বদলের কোনও পরিকল্পনা নেই।
