কলকাতা — বহু দশক ধরে ইতিহাসবিদ ও মুদ্রাবিশেষজ্ঞদের একাংশের মধ্যে প্রচলিত ধারণা ছিল, ‘সম্বৎ ১২৬২ ভাদ্র’ খোদাই করা বিখ্যাত অশ্বারোহী স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির আমলে তৈরি হয়েছিল। সেই ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই বাংলায় খলজির অভিযান এবং ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গজয়ের সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে বলে ইতিহাসের বিভিন্ন গবেষণাপত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে সম্প্রতি এক নতুন গবেষণাপত্রে সেই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে।
ম্যাটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষক জ্যোতিষ্মান সরকার দাবি করেছেন, ওই মুদ্রার তারিখ নির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক ভুল ব্যাখ্যা ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, মুদ্রায় ব্যবহৃত ‘সম্বৎ ১২৬২’কে বিক্রম সম্বৎ ধরে হিসাব করা হয়েছে। কিন্তু মধ্যযুগীয় বাংলা ও বিহারে শকাব্দের প্রাধান্য ছিল বেশি। ফলে ‘সম্বৎ ১২৬২’কে শকাব্দ হিসেবে গণনা করলে মুদ্রাটির সময়কাল ১৩৩৮ থেকে ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পড়ে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, পাল ও সেন যুগের একাধিক শিলালিপি এবং ভূমিদানের নথিতে শকাব্দ ব্যবহারের নজির পাওয়া যায়। সেন রাজারা দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাঁদের প্রশাসনিক নথিতেও শকাব্দের ব্যবহার ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। সেই কারণে বাংলা ও বিহারের স্থানীয় কারিগররা নাগরী লিপিতে কোনও তারিখ খোদাই করলে শকাব্দ ব্যবহার করাই স্বাভাবিক ছিল বলে মত গবেষকের।
এই যুক্তির ভিত্তিতে তিনি দাবি করেছেন, ‘সম্বৎ ১২৬২’কে যদি শকাব্দ ধরা হয়, তবে তার সমসাময়িক সময়কাল দাঁড়ায় ১৩৩৮-১৩৪০ খ্রিস্টাব্দ। সে ক্ষেত্রে মুদ্রাটি বখতিয়ার খলজির আমলের হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, কারণ খলজির মৃত্যু হয়েছিল ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে।
গবেষণাপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, ওই মুদ্রার প্রকৃত প্রেক্ষাপট খুঁজতে গেলে নজর দিতে হবে স্বাধীন বাংলার সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের শাসনকালের দিকে। ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে দিল্লি সুলতানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তিনি সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। নতুন শাসক হিসেবে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য মুদ্রা প্রচলন তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখকের দাবি, স্থানীয় হিন্দু প্রজাদের সমর্থন অর্জনের উদ্দেশ্যে নাগরী লিপি এবং স্থানীয় প্রতীক ব্যবহার করে মুদ্রা প্রকাশ করা হয়ে থাকতে পারে। অশ্বারোহী প্রতীকটিকেও তিনি স্থানীয় সামরিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
গবেষণাপত্রে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ঔপনিবেশিক যুগের কিছু ইতিহাসবিদ এবং পরবর্তী কালের গবেষকরা বখতিয়ার খলজির বঙ্গজয়ের বর্ণনাকে সমর্থন করার জন্য মুদ্রাটির তারিখ ব্যাখ্যায় বিক্রম সম্বৎ ব্যবহার করেছিলেন। এর ফলে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনাকাল নিয়ে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, এমন কোনও নতুন ব্যাখ্যা গ্রহণের আগে শিলালিপি, সমসাময়িক নথি, মুদ্রার ধাতব বিশ্লেষণ, টাকশালের পরিচয় এবং প্রতিষ্ঠিত গবেষণার সঙ্গে তুলনামূলক পর্যালোচনা প্রয়োজন। ফলে গবেষকের এই দাবি নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই।
ইতিহাস ও মুদ্রাবিদ্যার মহলে এই গবেষণাপত্র নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ‘সম্বৎ ১২৬২ ভাদ্র’ মুদ্রার প্রকৃত পরিচয় এবং তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে আগামী দিনে আরও গবেষণা ও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
