November 6, 2026
কলকাতা

প্রাচীন মঠ-মন্দির সংস্কারে ১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ঘোষণা

নিজস্ব সংবাদদাতা, নদিয়া: রাজ্যের প্রাচীন মঠ ও মন্দিরগুলিকে নতুন করে সাজিয়ে তোলা এবং ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থানগুলির সংরক্ষণের লক্ষ্যে এক হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রকল্প ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘তীর্থক্ষেত্র সার্কিট’। আগামী দু’বছরে ধাপে ধাপে এই অর্থ খরচ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। শুক্রবার নদিয়ার আরংঘাটায় শতদল ক্লাবের কালীপুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এই ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বহু প্রাচীন মঠ ও মন্দির রয়েছে, যেগুলি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে জীর্ণ হয়ে পড়েছে। ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও যথাযথ পরিচর্যার অভাবে বেশ কিছু দেবস্থান হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই স্থানগুলি চিহ্নিত করে সংস্কার, সংরক্ষণ এবং সৌন্দর্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর ফলে বাংলার ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি পর্যটনের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি বা সম্পত্তি রাখা হবে না বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। দেবোত্তর সম্পত্তি, ট্রাস্ট পরিচালিত মঠ-মন্দির এবং সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত প্রাচীন ধর্মীয় স্থানগুলিকেই সংস্কারের জন্য বেছে নেওয়া হবে। তবে প্রথম পর্যায়ে কোন কোন মন্দির বা মঠ এই প্রকল্পের আওতায় আসবে, তার তালিকা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্যোগে কেদারনাথ, বদ্রীনাথ, অযোধ্যা, কাশী-বারাণসী এবং উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দিরের সংস্কারের উদাহরণও তুলে ধরেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, একই ধরনের উদ্যোগে বাংলার প্রাচীন ধর্মীয় স্থানগুলিকেও নতুন করে সাজিয়ে তোলা হবে। মঠ-মন্দিরের সংস্কারের পাশাপাশি সেগুলিকে তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

জগদ্ধাত্রী পুজো ও রাস উৎসবেও বিশেষ আয়োজন
প্রাচীন মন্দির সংস্কারের পাশাপাশি আসন্ন জগদ্ধাত্রী পুজো এবং রাস উৎসবকে ঘিরেও একাধিক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। চন্দননগর ও কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজো উপলক্ষে বিশেষ সাজসজ্জার ব্যবস্থা করা হবে। দুই শহরেই তিনি নিজে উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, নবদ্বীপ, শান্তিপুর এবং কোচবিহারে রাস উৎসব উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন করা হবে। আগামী ২২ নভেম্বর নবদ্বীপে গিয়ে প্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের ধামে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এই উৎসবগুলিকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ানো এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের সম্ভাবনাও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি গঙ্গাসাগর মেলায়
গঙ্গাসাগর মেলার প্রস্তুতি নিয়েও বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, মেলাকে আন্তর্জাতিক মেলার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং আগামী আয়োজনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও বহু পুণ্যার্থী ও পর্যটক গঙ্গাসাগরে আসেন। তাঁদের যাতায়াত, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য পরিষেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ।

নারী সুরক্ষা ও দুর্গাপুজো নিয়েও বক্তব্য
অনুষ্ঠানে হাঁসখালির প্রসঙ্গ তুলে নারী সুরক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। আগের সরকারের আমলে দুর্গাপুজোর বিসর্জন এবং শোভাযাত্রা ঘিরে বিধিনিষেধ ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, বিসর্জনের শোভাযাত্রায় কাঁসর-ঘণ্টা বাজানো নিয়েও একসময় কড়াকড়ি করা হয়েছিল।

রাজ্যে দুর্গাপুজোর সংখ্যা বৃদ্ধির প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগে যেখানে প্রায় ১৩ হাজার দুর্গাপুজো হতো, বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ৫৮ হাজারে পৌঁছেছে। চলতি বছরে রাজ্যের সর্বত্র নির্বিঘ্নে পুজো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। যদিও এই পরিসংখ্যানের বিস্তারিত সরকারি হিসাব অনুষ্ঠানে প্রকাশ করা হয়নি।

সব মিলিয়ে ‘তীর্থক্ষেত্র সার্কিট’ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে রাজ্যের ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং পর্যটন প্রসারের নতুন পরিকল্পনা সামনে এসেছে। তবে প্রকল্পের বাস্তবায়নে কোন কোন মঠ-মন্দিরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কীভাবে অর্থ বরাদ্দ হবে এবং সংস্কারের কাজ কত দিনে শেষ হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আগামী দু’বছরে ঘোষিত অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং কাজের অগ্রগতি এই প্রকল্পের সাফল্য নির্ধারণ করবে।

Related posts

Leave a Comment