October 31, 2026
রাজ্য

স্বাস্থ্যসাথীতে ৩০ লক্ষ উপভোক্তার খোঁজ নেই

সংবাদ কলকাতা: স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে বিপুল আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলল রাজ্যের নতুন সরকার। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ উপভোক্তার পরিচয় ও অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও ভুয়ো রোগীর নামে চিকিৎসার বিল, কোথাও অস্তিত্বহীন নার্সিংহোমের নামে টাকা তোলার অভিযোগ সামনে এসেছে। ভুয়ো চিকিৎসক, জাল স্বাক্ষর এবং বেআইনি ভাবে বিমার টাকা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই আর্থিক ফরেন্সিক অডিট শুরু করেছে স্বাস্থ্য দপ্তর। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের দাবি, প্রাথমিক ভাবে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের ইঙ্গিত মিলেছে। তাঁর অভিযোগ, এই দুর্নীতির অর্থের গতিপথ কালীঘাট বা তৃণমূলের কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে খবর, আয়ুষ্মান ভারত এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনার আওতায় উপভোক্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে স্বাস্থ্যসাথীর পুরনো তথ্য যাচাই শুরু হয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে উপভোক্তাদের পরিচয় ও ঠিকানা খতিয়ে দেখতে গিয়ে বিপুল সংখ্যক কার্ডধারীর কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ। প্রাথমিক যাচাইয়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ উপভোক্তার তথ্য সন্দেহের তালিকায় এসেছে। তবে এই প্রত্যেকটি কার্ড যে ভুয়ো, তা এখনও চূড়ান্ত ভাবে প্রমাণিত হয়নি। তথ্য যাচাই ও তদন্ত চলছে।

অনিয়মের ধরন নিয়েও একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের দাবি, কোনও কোনও ক্ষেত্রে যে রোগীর নামে চিকিৎসার বিল জমা পড়েছে, বাস্তবে সেই রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্যই নেই। কোথাও রোগের বিবরণ এক রকম দেখিয়ে অন্য চিকিৎসার জন্য বিল করা হয়েছে। এমনকি যে নার্সিংহোমের নামে চিকিৎসার দাবি করা হয়েছে, তার অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভুয়ো চিকিৎসকের নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে বিল জমা দেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শুক্রবার সংবাদমাধ্যমের সামনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় জানান, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের তথ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে প্রাথমিক স্তরেই ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের ইঙ্গিত মিলেছে। তাঁর কথায়, এটি দুর্নীতির হিমশৈলের চূড়ামাত্র। আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসতে পারে। তাঁর দাবি, ভুয়ো উপভোক্তা, রোগী, চিকিৎসক হাসপাতাল এবং থার্ড পার্টি অ্যাডমিনিস্ট্রেটরদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দুর্নীতির অর্থ কোথায় গিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, এই আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তি বা প্রভাবশালী মহলের যোগ রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। টাকার গতিপথ কালীঘাট বা তৃণমূলের কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছেছে কি না, সেই সম্ভাবনার কথাও বলেছেন তিনি। তবে এই অভিযোগের পক্ষে এখনও কোনও চূড়ান্ত তদন্তের ফল প্রকাশিত হয়নি।

কী ভাবে প্রথম অনিয়মের বিষয়টি নজরে এল? স্বাস্থ্য দপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, বর্ধমানের আহাদ মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতালের জমা দেওয়া বিল পরীক্ষা করতে গিয়ে প্রথম বড়সড় অসঙ্গতি ধরা পড়ে। ১৪৪টি স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের সঙ্গে চিকিৎসার বিলের তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হলেও সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি বলে দাবি দপ্তরের।



এর পর বিভিন্ন জেলার বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমের জমা দেওয়া বিল খতিয়ে দেখতে শুরু হয়। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি এবং বর্ধমানের একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। কয়েকটি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমকে কারণ দর্শানোর নোটিসও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত দুটি থার্ড পার্টি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বা টিপিএ-কে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। একাধিক বিমা সংস্থার ভূমিকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের প্রতিটি চিকিৎসার বিল অনুমোদন, বিমার টাকা মেটানো এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা শুরু হয়েছে। কোনও চিকিৎসার প্যাকেজের প্রকৃত খরচের তুলনায় বেশি টাকা দাবি করা হয়েছিল কি না, চিকিৎসা না করিয়েই বিল জমা পড়েছিল কি না, সেই সমস্ত দিক তদন্তের আওতায় রয়েছে।

তবে স্বাস্থ্য দপ্তরের এই অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা এখনও ফরেন্সিক অডিটের রিপোর্টে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশেষ করে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এবং কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের যোগ রয়েছে কি না, তা তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে। তৃণমূলের তরফে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার কথা প্রকাশিত হলেও নির্দিষ্ট অভিযোগগুলির বিষয়ে বিস্তারিত জবাব এখনও স্পষ্ট ভাবে সামনে আসেনি।

প্রাথমিক ভাবে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার অনিয়মের কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। অন্য দিকে, প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ উপভোক্তার তথ্য যাচাই চলছে। এই দুই পরিসংখ্যানকে এক করে ৩০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করার মতো তথ্য এখনও নেই। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ অডিট শেষ হলে আর্থিক অনিয়মের প্রকৃত পরিমাণ এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় আরও স্পষ্ট হতে পারে।

Related posts

Leave a Comment