নিজস্ব সংবাদদাতা, পূর্ব মেদিনীপুর: বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের প্রত্যাশিত বিকাশ হয়নি বলে অভিযোগ তুললেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, বর্তমান রাজ্য সরকার শিল্প, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রতি মাসেই উন্নয়নমূলক কাজের অগ্রগতি দেখা যাবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে স্কুলে পাশ-ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনার পক্ষেও নিজের মত প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে পাঠ্যক্রম কমিটির সুপারিশ এবং জাতীয় শিক্ষানীতির বিষয়টি বিবেচনা করেই।
রবিবার, ২৫ অক্টোবর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিনে পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজের মতামত জানান শুভেন্দু। এর আগে উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপুজোয় পদপিষ্ট হয়ে মৃত কল্পনা জানার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। কল্পনা পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগরের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর পরিবারের হাতে সরকারি সাহায্য তুলে দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের দুই খুদে সদস্যের অভিভাবক হিসেবে পাশে থাকার আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী। দুর্ঘটনায় মৃত অন্য দুই ভিন্রাজ্যের বাসিন্দার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাই যাবেন বলেও জানান তিনি।

কল্পনার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর শুভেচ্ছা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসুক, যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান বাড়ুক এবং কৃষকদের উন্নতি হোক—এটাই তাঁর প্রার্থনা। পরিযায়ী শ্রমিকেরা যাতে কাজের সুযোগ পেয়ে নিজেদের রাজ্যে ফিরতে পারেন, সেই পরিবেশ গড়ে তোলার উপরেও জোর দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য শিল্পের প্রসার এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা জরুরি।
শিল্পে বিনিয়োগে জোর
রাজ্যের শিল্প পরিস্থিতি নিয়ে বলতে গিয়ে শুভেন্দু জানান, বিভিন্ন জায়গায় ইতিমধ্যেই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। কয়েকটি প্রকল্পের ভূমিপূজনও সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি তাঁর। রাজ্য ও জাতীয় স্তরের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলি পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, শিল্পের প্রসারে এই উদ্যোগ একবারের জন্য নয়, ধারাবাহিকভাবে চলবে। প্রতি মাসেই নতুন কোনও কাজ বা প্রকল্পের অগ্রগতি সামনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
আগের সরকারের আমলে আয়োজিত বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনকে নিশানা করে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, সম্মেলনের নামে শত শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও রাজ্যে শিল্পের প্রত্যাশিত বিকাশ ঘটেনি। শিল্পের নামে প্রতারণা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। শুভেন্দুর বক্তব্য, বিনিয়োগকারীদের জন্য রাজ্যের দরজা খোলা থাকলেও প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত কোনও সংস্থাকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
বর্তমান সরকারের কাজের ধরন ব্যাখ্যা করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, শুধু বড় আয়োজন বা বৈঠকের উপর নির্ভর না করে বাস্তবে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই তাঁদের লক্ষ্য। শিল্প সংস্থাগুলির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং ঘোষিত প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নের উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তাঁর। তবে বিনিয়োগের প্রস্তাব কতটা বাস্তবে রূপায়িত হয় এবং তার ফলে কত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়, আগামী দিনে তার উপরেই রাজ্যের শিল্প উদ্যোগের সাফল্য অনেকটা নির্ভর করবে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রেও একাধিক উদ্যোগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শুভেন্দু। বিশেষ করে যুবক-যুবতীদের দক্ষতা বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ভারতীয় প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার উদ্যোগ চলছে বলে জানান তিনি। আদানি-সহ একাধিক বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলেও দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, শিল্পের সঙ্গে দক্ষতা বৃদ্ধির কর্মসূচিকে যুক্ত করা গেলে তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্কুলে ফিরতে পারে পাশ-ফেল প্রথা?
শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রসঙ্গ উঠতেই স্কুলে পাশ-ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনার পক্ষে নিজের মত প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, পড়ুয়াদের শিক্ষার মান যাচাই এবং পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে মূল্যায়ন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকার একতরফা সিদ্ধান্ত নেবে না বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
শুভেন্দু জানিয়েছেন, পাশ-ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পাঠ্যক্রম কমিটির সুপারিশের জন্য অপেক্ষা করা হবে। জাতীয় শিক্ষানীতির দিকটিও বিবেচনায় রাখা হবে। শিক্ষা দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার উপর আস্থা প্রকাশ করে তিনি জানান, কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পরেই পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ফলে পাশ-ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনার পক্ষে মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত মত থাকলেও, এখনই তা কার্যকর হচ্ছে—এমন কোনও ঘোষণা হয়নি।
পড়ুয়াদের মধ্যে দেশপ্রেম, রাষ্ট্রচেতনা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার উপরেও জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর প্রস্তাব, স্কুলে প্রতি বছর অন্তত তিন দিন বিতর্ক, কুইজ এবং তাৎক্ষণিক বক্তৃতার মতো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হোক। এর মাধ্যমে পড়ুয়াদের আত্মবিশ্বাস, যুক্তি দিয়ে কথা বলার দক্ষতা এবং সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

পাশাপাশি, পড়ুয়াদের দেশের ইতিহাসের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস সম্পর্কেও সঠিক ধারণা দেওয়ার কথা বলেছেন শুভেন্দু। ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য ব্রতচারী, জাতীয় সেবা প্রকল্প এবং জাতীয় ক্যাডেট বাহিনীর মতো কার্যক্রম স্কুলে ফিরিয়ে আনার উপরেও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
শিল্পে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন—সব ক্ষেত্রেই নতুন উদ্যোগের কথা সামনে এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে শিল্পের ক্ষেত্রে ঘোষিত প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন এবং শিক্ষাক্ষেত্রে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর থাকবে।
