26 C
Kolkata
October 25, 2026
Featured

প্রয়াত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী

ফাইল চিত্র

সংবাদ কলকাতা: প্রয়াত বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ যোগেন চৌধুরী। রবিবার, ২৫ অক্টোবর সকালে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। দীর্ঘ ১৪ মাস ধরে বিরল ধরনের ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন শিল্পী। চলছিল কেমোথেরাপি। দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মূত্রনালির সংক্রমণের পাশাপাশি সেপসিসের উপসর্গ দেখা দেওয়ায় ক্রমশ সংকটজনক হয়ে ওঠে তাঁর শারীরিক অবস্থা। শনিবার তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে না ফেরার দেশে চলে গেলেন বাংলার এই বিশিষ্ট শিল্পী।

১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের দাহারপাড়া গ্রামে জন্ম যোগেন চৌধুরীর। তাঁর বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন জমিদার। ছোটবেলা থেকেই শিল্পের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল তাঁর। মায়ের আলপনা দেওয়ার দক্ষতা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সেই সূত্রেই আঁকার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। দেশভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন তিনি। পরবর্তী সময়ে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফ্টে শিল্পশিক্ষা গ্রহণ করেন।

পড়াশোনা শেষ করে হাওড়া জেলা স্কুলে অঙ্কন শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন যোগেন। ১৯৬২ সালে কলকাতার হ্যান্ডলুম বোর্ডে নকশাকার হিসেবে যোগ দেন। শিল্পচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করতে ১৯৬৫ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য প্যারিসে যান তিনি। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারিতে কিউরেটরের দায়িত্বও পালন করেন। শিল্পী হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে ভারতীয় শিল্পের ঐতিহ্য এবং ইউরোপীয় শিল্পধারার বিভিন্ন প্রভাব দেখা গিয়েছে।

স্বতন্ত্র শিল্পশৈলীতে গড়েছিলেন নিজস্ব পরিচিতি
যোগেন চৌধুরীর ছবির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর স্বতন্ত্র রেখার ব্যবহার, মানবদেহের অভিব্যক্তিপূর্ণ উপস্থাপনা এবং সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরার ক্ষমতা। রাজনীতি, ক্ষমতার দম্ভ, সামাজিক বৈষম্য ও মানুষের অসহায়তার মতো বিষয় তাঁর শিল্পকর্মে বারবার উঠে এসেছে। ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে সমাজের নানা অসংগতিকে তুলে ধরতেন তিনি। ভারতীয় শিল্পের নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে ইউরোপীয় আধুনিক শিল্পধারার প্রভাব মিলিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক স্বতন্ত্র ভাষা।

শুধু ছবি আঁকাই নয়, বাংলার দুর্গাপুজোর শিল্পভাবনাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন যোগেন। বিভিন্ন সময়ে একাধিক দুর্গাপুজোর থিম ও প্রতিমার নকশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০১৭ সালে বেহালা নূতন দলের দুর্গাপুজোয় প্রতিমার স্কেচ তৈরি করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ঠাকুরপুকুর স্টেট ব্যাঙ্ক পার্ক সর্বজনীনের প্রতিমার চালচিত্রের নকশাতেও তাঁর শিল্পভাবনার ছাপ পড়েছিল। ফলে গ্যালারির বাইরে সাধারণ মানুষের উৎসবের মধ্যেও তাঁর শিল্প পৌঁছে গিয়েছিল।

শিল্পের পাশাপাশি ছিল রাজনৈতিক পরিচয়
শিল্পজগতের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন যোগেন চৌধুরী। ২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি। ২০২০ সাল পর্যন্ত সংসদের উচ্চকক্ষে দায়িত্ব পালন করেন। শিল্প ও সংস্কৃতির জগতের সঙ্গে যুক্ত এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক জীবনও তাঁকে বৃহত্তর জনপরিসরে পরিচিতি দিয়েছিল।

দীর্ঘ শিল্পজীবনে দেশ-বিদেশে একাধিক সম্মান ও স্বীকৃতি পেয়েছেন যোগেন। তাঁর আঁকার নিজস্ব ধরন, মানুষের মনস্তত্ত্বের প্রতি সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমাজের প্রতি পর্যবেক্ষণ তাঁকে আধুনিক ভারতীয় শিল্পের অন্যতম পরিচিত মুখ করে তুলেছিল। তাঁর ছবিতে যেমন মানুষের আবেগ ও অসহায়তা ধরা পড়েছে, তেমনই উঠে এসেছে সমাজ ও ক্ষমতার নানা টানাপোড়েন।

যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে ভারতীয় শিল্পজগতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হল। তাঁর রেখে যাওয়া শিল্পকর্ম, স্বতন্ত্র রেখার ভাষা এবং শিল্পের মাধ্যমে সমাজকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আগামী দিনেও শিল্পপ্রেমী ও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।

Related posts

Leave a Comment