নিজস্ব সংবাদদাতা, নদিয়া: শিশু নির্যাতন ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতার বার্তা দিতে অভিনব উদ্যোগ নিলেন নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জের শিবনিবাস হালদার পাড়ার এক পরিযায়ী শ্রমিক দম্পতি। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর পুণ্যতিথিতে প্রতিমার পরিবর্তে নিজেদের আট বছরের মেয়ে শ্রুতিকে দেবী লক্ষ্মীরূপে সাজিয়ে পুজো করলেন দেবাশীষ বিশ্বাস ও লক্ষ্মী বিশ্বাস। তাঁদের এই উদ্যোগ ঘিরে এলাকায় কৌতূহল তৈরি হয়েছে। মেয়েদের প্রতি সম্মান, নারী নিরাপত্তা এবং ছেলে-মেয়ের মধ্যে বৈষম্য দূর করার বার্তাই দিতে চেয়েছে বিশ্বাস পরিবার।
পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক নারী নির্যাতন ও নৃশংস অপরাধের ঘটনা তাঁদের গভীরভাবে ভাবিয়েছে। আরজি করের ঘটনা থেকে শুরু করে কুলতলীর উমা খুন এবং কৃষ্ণনগরের অতীতের অপরাধের ঘটনাগুলির কথা উল্লেখ করে দেবাশীষ জানান, সমাজে নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। সেই বার্তা ছড়িয়ে দিতেই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় নিজের মেয়েকে দেবীরূপে আরাধনা করার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।

দেবাশীষ বিশ্বাসের বক্তব্য, সমাজের একাংশ এখনও কন্যাসন্তানকে অবহেলার চোখে দেখে। ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ভেদাভেদ করার এই মানসিকতা বদলানো প্রয়োজন। মেয়েরা যে পরিবারের গর্ব এবং তাঁদেরও সমান সম্মান প্রাপ্য, সেই বার্তাই দিতে চেয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, সন্তানকে শুধু জন্ম দেওয়াই নয়, তাকে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বড় করে তোলাও বাবা-মায়ের দায়িত্ব।
মা লক্ষ্মী বিশ্বাসও মেয়েকে এ ভাবে পুজো করতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। তাঁর কথায়, মেয়ে তাঁদের কাছে সত্যিই লক্ষ্মী। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিনে তাকে দেবীরূপে পুজো করতে পেরে তাঁরা গর্বিত। পরিবারের এই উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজে কন্যাসন্তানের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা তাঁদের।
পুজোর আয়োজনেও উঠে এসেছে সমাজের বিভিন্ন বঞ্চনার প্রসঙ্গ। দেবাশীষ জানিয়েছেন, ন্যায়বিচারের দাবিতে যাঁরা আন্দোলন করছেন এবং যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন, তাঁদের দুর্দশার অবসান কামনা করে মা লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা করেছেন তাঁরা। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ যেন নিজেদের অধিকার ফিরে পান এবং পরিবার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন, সেই কামনাও করেছেন দম্পতি।
পুজোর পুরোহিত তরুণ ব্যানার্জি বলেন, মেয়েরা মায়ের সমান। কন্যাসন্তানকে লক্ষ্মীরূপে পুজো করার মধ্যে কোনও বিধিগত বাধা নেই বলেই তাঁর মত। সমাজ থেকে শিশু নির্যাতন দূর করা এবং নারীদের মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

দুর্গাপুজোর সময় অনেক জায়গায় কুমারী পুজোর প্রচলন রয়েছে। তবে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় নিজের কন্যাকে দেবী লক্ষ্মীরূপে সাজিয়ে পুজো করার এই উদ্যোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের নজর কেড়েছে। শ্রুতিকে আশীর্বাদ জানাতে এবং পুজো দেখতে এলাকার বহু মানুষ সেখানে উপস্থিত হন বলে পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে।
বিশ্বাস দম্পতির এই উদ্যোগ শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কন্যাসন্তানের মর্যাদা, নারী নিরাপত্তা এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি বার্তা। তাঁদের আশা, ঘরে ঘরে মেয়েদের সমান সম্মান দেওয়ার মানসিকতা গড়ে উঠলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ আরও প্রশস্ত হবে।
