দিল্লি— ভারতের সভাপতিত্বে ব্রিকস সম্মেলনে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য সামনে এল। একদিকে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সদস্য দেশগুলির মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করে সর্বসম্মত নতুন দিল্লি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দীর্ঘ বৈঠক ভারত-চিন সম্পর্ককে আরও স্থিতিশীল করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ভারতের কূটনীতিকদের জন্য এই দুই ঘটনাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ব্রিকসের সম্প্রসারিত সদস্যদের মধ্যে আঞ্চলিক স্বার্থের পার্থক্য যথেষ্ট। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশগুলির পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে অবস্থান ও স্বার্থও এক নয়। সেই পরিস্থিতিতে কোনও একটি পক্ষকে সরাসরি দায়ী না করে উত্তেজনা কমানোর পক্ষে একটি অভিন্ন ভাষা তৈরি করা ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ছিল।

পশ্চিম এশিয়া নিয়ে ঐকমত্য, ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য
ব্রিকসের নতুন দিল্লি ঘোষণাপত্রে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ সংযম দেখানো এবং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করতে পারে এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ঘোষণাপত্রে কোনও নির্দিষ্ট দেশকে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির জন্য সরাসরি দায়ী করা হয়নি। সদস্য দেশগুলির বিভিন্ন সংবেদনশীলতা মাথায় রেখে এই ভারসাম্যপূর্ণ ভাষা তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও ব্রিকস নেতারা একটি যৌথ অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছেন।
ভারতের কূটনৈতিক মহলের কাছে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর আগে ব্রিকসের বিদেশমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে গভীর মতপার্থক্যের কারণে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। সেই জায়গা থেকে এবার শীর্ষ সম্মেলনে সর্বসম্মত ঘোষণাপত্র প্রকাশ হওয়া ভারতের সভাপতিত্বের পক্ষে বড় সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
৪৫ পাতার বিস্তারিত ঘোষণাপত্রে মোট ১৪০টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয়েও সদস্য দেশগুলি নিজেদের অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছে।

দিল্লিতে ইরান-আমিরশাহি বৈঠকেও বাড়ল ভারতের গুরুত্ব
ব্রিকস সম্মেলনের আবহেই দিল্লিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির যুবরাজ শেখ মহম্মদ বিন জায়েদের বৈঠকও বিশেষ নজর কেড়েছে। পশ্চিম এশিয়ার উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই সাক্ষাৎ ভারতের কূটনৈতিক পরিসরের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
ব্রিকসের মঞ্চে ভারত যে ভারসাম্যের নীতি নিয়েছে, তার সঙ্গে এই ঘটনাও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কোনও পক্ষের হয়ে সরাসরি অবস্থান না নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছে দিল্লি।
মোদী-শি বৈঠক, সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে আরও এক ধাপ
সম্মেলনের দ্বিতীয় বড় সাফল্য হিসেবে সামনে এসেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক। প্রায় ৫০ মিনিটের এই আলোচনায় দুই দেশের সম্পর্ক, সীমান্ত পরিস্থিতি, বাণিজ্য এবং পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে মতবিনিময় হয়।
দুই নেতার বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ২০২০ সালের সীমান্ত উত্তেজনার পর ভারত-চিন সম্পর্কে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি কাটেনি। গত কয়েক বছরে ধাপে ধাপে সামরিক উত্তেজনা কমানো এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার দিল্লিতে সরাসরি শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক নতুন বার্তা দিয়েছে।
মোদী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন বিরোধে পরিণত না হয়। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখা এবং পারস্পরিক আস্থা বাড়ানোকে ভারত-চিন সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখেছে দিল্লি।
শি জিনপিংও ভারত-চিন সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার কথা বলেছেন। চিনের সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোগিতার অংশীদার হিসেবে দেখা উচিত। দুই দেশের উন্নয়ন পরস্পরের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে বলেও বার্তা দিয়েছেন তিনি।

তবে চিনকে নিয়ে সতর্ক ভারত
সম্পর্কের বরফ গললেও চিনের ক্ষেত্রে কোনও রকম আত্মতুষ্টির জায়গা নেই—দিল্লির অবস্থান মোটের উপর এমনই। সীমান্ত সমস্যা এখনও পুরোপুরি মেটেনি। অতীতের চুক্তি ও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের উদ্বেগও রয়েছে।
তাই শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠককে ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও, কৌশলগত সতর্কতা বজায় রেখেই এগোতে চাইছে দিল্লি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, সীমান্তে শান্তি এবং পারস্পরিক আস্থার ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি কতটা হয়, সেটাই আগামী দিনের মূল পরীক্ষা।
পুতিনের সঙ্গেও মোদীর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা
ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা, শক্তি, মহাকাশ, দক্ষতা এবং মানুষে-মানুষে যোগাযোগ নিয়ে সহযোগিতার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। চলতি বছরে এটি দুই নেতার দ্বিতীয় বৈঠক বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর।
রাশিয়ার শিল্প প্রদর্শনী ভারতে আয়োজন এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক ও শিল্প সম্পর্ক আরও বিস্তারের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ইউক্রেন সংঘাত নিয়েও ভারত বরাবরই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সব মিলিয়ে ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের সামনে এখন দু’টি বড় কূটনৈতিক বার্তা স্পষ্ট। প্রথমত, মতপার্থক্যে ভরা একটি বহুপাক্ষিক মঞ্চেও ভারত আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্য তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, চিন ও রাশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শক্তির সঙ্গে একই সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ বজায় রেখে নিজের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে এগোতে সক্ষম দিল্লি।
ভারতের সভাপতিত্বে ব্রিকস সম্মেলনের এই ফলাফল তাই শুধু একটি সম্মেলনের সাফল্য নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকারও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
