September 13, 2026
রাজ্য

প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে অস্ত্র করলে বাধা পাবে বিশ্বের অগ্রগতি, ব্রিকস মঞ্চে কড়া বার্তা মোদীর

দিল্লি— প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে কোনও দেশের স্বার্থে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হলে বিশ্বের সম্মিলিত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর বক্তব্য, প্রযুক্তির সুবিধা যেন কেবল কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জোগান ও সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী এবং নির্ভরযোগ্য করতে ব্রিকস দেশগুলিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মোদী প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ভবিষ্যতের সহযোগিতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেন। ভারতের সভাপতিত্বে চলতি বছরের ব্রিকস কর্মসূচির মূল ভিত্তি হিসেবে স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্ব—এই চারটি বিষয়কে সামনে রাখা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের অস্ত্রীকরণ আমাদের সম্মিলিত অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থার উপর জোর দিয়েছি।’

মোদীর এই বক্তব্য এমন সময়ে এল, যখন ব্রিকস দেশগুলি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ ব্যবস্থা আরও নিরাপদ ও বহুমুখী করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে নতুন দিল্লি ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেছে। ঘোষণাপত্রে সম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলির নিজেদের খনিজ সম্পদের উপর সার্বভৌম অধিকারকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার বার্তা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একের পর এক আন্তর্জাতিক সঙ্কট দেখিয়েছে, কোনও একটি অঞ্চলের সমস্যা খুব দ্রুত অন্য দেশগুলিকেও প্রভাবিত করতে পারে। মহামারি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে সরাসরি পড়েছে।


এই পরিস্থিতিতে ব্রিকসের মধ্যে স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান মোদী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের সরবরাহ ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যাতে কোনও একটি সঙ্কট গোটা ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে না পারে।

এই লক্ষ্যেই ব্রিকস সরবরাহ শৃঙ্খলা সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এর উদ্দেশ্য হল সদস্য দেশগুলির মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থা আরও নির্ভরযোগ্য, স্থিতিশীল এবং সঙ্কট মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলা।

রোগ ও বিপর্যয় মোকাবিলাতেও সহযোগিতা

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও বিপর্যয় মোকাবিলার ক্ষেত্রেও ব্রিকসের যৌথ উদ্যোগের কথা জানান মোদী। সংক্রামক রোগের জন্য একটি সমন্বিত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং বিপর্যয় মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা সংক্রান্ত তথ্য একত্র করার নির্দেশিকার কথা তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, কোনও সঙ্কট দেখা দেওয়ার পরে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে আগেই তার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এই কারণেই আগাম সতর্কতা ও তথ্য বিনিময়ের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কৃষিতে নতুন উদ্যোগ

প্রযুক্তি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একাধিক উদ্যোগের কথা বলেন মোদী। ব্রিকসের মধ্যে নতুন উদ্যোগপতি এবং নতুন সংস্থাগুলির পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়াতে ইনকিউবেটর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। উদ্ভাবনী ও দ্রুত সম্প্রসারণযোগ্য উদ্যোগকে সহায়তা করতে একটি ব্রিকস নতুন উদ্যোগ উদ্ভাবন তহবিলের প্রস্তাবও সামনে এসেছে।


কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। কৃষকদের প্রয়োজনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভৌগোলিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল সরকারি পরিকাঠামোকে যুক্ত করার লক্ষ্যে ব্রিকস ডিজিটাল কৃষি নেটওয়ার্কের কথা তুলে ধরেন তিনি।

মোদীর মতে, প্রযুক্তির আসল সাফল্য তখনই, যখন তার সুবিধা সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছবে। শুধু উন্নত দেশ বা বড় সংস্থার হাতে প্রযুক্তির সুবিধা সীমাবদ্ধ থাকলে তার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব নয়।

উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য ব্রিকসের উদ্যোগ

ব্রিকসের মধ্যে তৈরি হওয়া সমাধান যাতে শুধু সদস্য দেশগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সেই বার্তাও দেন মোদী। তাঁর বক্তব্য, ব্রিকসের তৈরি প্রযুক্তি ও নীতিগত সমাধানকে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাদের জন্য আলাদা করে সমাধান তৈরি করার বদলে তাদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করেই সমাধান তৈরি করা উচিত।

কর্মসংস্থান, দক্ষতা বৃদ্ধি, মহিলাদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ, সামাজিক সুরক্ষা ও প্রশিক্ষণের মতো ক্ষেত্রগুলিতে সহযোগিতা বাড়াতে ব্রিকসের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলিকে অর্থ, বাজার ও জ্ঞানভিত্তিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে।

উন্নয়ন ও পরিবেশ পরস্পরের পরিপূরক

টেকসই উন্নয়নের প্রসঙ্গেও নিজের বক্তব্যে জোর দেন মোদী। তাঁর কথায়, ভারতীয় সভ্যতায় প্রকৃতিকে মায়ের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তাই উন্নয়ন ও পরিবেশকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে না দেখে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।

শক্তি সঞ্চয় ও স্মার্ট বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য ব্রিকস ডিজিটাল উৎকর্ষ কেন্দ্র এবং কৃষি-পরিবেশ ও পুনরুজ্জীবনশীল কৃষির জন্য উৎকর্ষ কেন্দ্রের কথাও তুলে ধরেন তিনি। ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় স্থানীয় জ্ঞানকে কাজে লাগানোর উপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।


নতুন দিল্লি ঘোষণাপত্রেও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য, দায়িত্বশীল, বৈচিত্র্যময়, স্থিতিশীল, ন্যায্য এবং টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। শক্তি নিরাপত্তা এবং কম নিঃসরণভিত্তিক শক্তি প্রযুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ভূমিকার কথাও স্বীকার করেছে ব্রিকস।

মোদীর বক্তব্যে স্পষ্ট, ভারত ব্রিকসকে শুধু আলোচনার মঞ্চ হিসেবে নয়, বাস্তব সমস্যার সমাধান তৈরির একটি কার্যকর সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে এগিয়ে নিতে চাইছে। প্রযুক্তি, খনিজ, কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে একসঙ্গে যুক্ত করে বৃহত্তর উন্নয়নশীল বিশ্বের কাছে ব্রিকসের উদ্যোগ পৌঁছে দেওয়াই ভারতের লক্ষ্য।

Related posts

Leave a Comment