সংবাদ কলকাতা: নামের পাশে এমবিবিএস, এমডি। রয়েছে মেডিক্যাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন নম্বরও। অথচ অভিযোগ, ডাক্তারি পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রবেশিকা পরীক্ষাতেই বসেননি! এমবিবিএস পাস করা তো দূরের কথা, জয়েন্ট এন্ট্রান্স বা বর্তমানে ‘নিট’ পরীক্ষাতেও বসেননি—এমন কয়েকশো ‘জাল ডাক্তার’ রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকার অভিযোগ উঠেছে। ভিনরাজ্য থেকে ভুয়ো ডিগ্রি জোগাড় করে তা দেখিয়ে মেডিক্যাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এই ঘটনায় বড়সড় চক্রের আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকদের একাংশ। অভিযোগ, ভুয়ো ডিগ্রির নথি ব্যবহার করে ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে রেজিস্ট্রেশন নম্বর সংগ্রহ করা হয়েছে। এমনকী, রেজিস্ট্রেশন পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিং হোমের সম্পাদক ডা. রাজীব পাণ্ডের দাবি, প্রার্থী পিছু প্রায় ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়ে থাকতে পারে। যদিও এই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনও হয়নি। তাঁর বক্তব্য, গোটা ঘটনায় ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভিতরের একটি চক্রের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এই অভিযোগের তদন্ত চেয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের কাছে চিঠি দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিং হোম। নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে মেডিক্যাল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরানোর দাবিও জানিয়েছেন ডা. রাজীব পাণ্ডে। তাঁর দাবি, তদন্তের আওতায় যাঁদের নাম বা ভূমিকা আসতে পারে, তাঁদের পদে রেখে নিরপেক্ষ তদন্ত করা কঠিন।
ইতিমধ্যেই এমন দু’জন চিকিৎসকের সন্ধান পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ডা. জুলফিকার মণ্ডল এবং ডা. শেখ সাইদুর হক। অভিযোগ, দু’জনেরই চিকিৎসা সংক্রান্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে।
ডা. জুলফিকার মণ্ডলের মেডিক্যাল কাউন্সিল রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৮৯০২১ বলে দাবি করা হয়েছে। নিউটাউনের ডিডি ব্লকে তাঁর একটি নার্সিংহোম রয়েছে। বারাসাতের বামুনপাড়াতেও রয়েছে আরও একটি নার্সিংহোম। সেখানে তাঁর নামের পাশে এমবিবিএস, ডিজিও এবং এমডি ডিগ্রি লেখা রয়েছে। তিনি বিহারের শ্রীকৃষ্ণ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস করেছেন বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু বিহারের মেডিক্যাল বোর্ডের তরফে সেই তথ্য নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ।
অন্যদিকে, পূর্ব বর্ধমানে এক শিশুর ফাইমোসিসের অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়েই ডা. শেখ সাইদুর হকের নাম সামনে আসে বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁর ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৮০১৯৮। অভিযোগ, একাধিক বেসরকারি নার্সিংহোমে সার্জন হিসেবে কাজ করলেও তিনি আদৌ এমবিবিএস পাস করেননি।

ঘটনায় আরও বড় আর্থিক দুর্নীতির আশঙ্কাও করছেন অভিযোগকারীরা। ডা. রাজীব পাণ্ডের দাবি, অতীতে ‘স্বাস্থ্য সাথী’ প্রকল্পের মাধ্যমে এই ধরনের ভুয়ো চিকিৎসকেরা বেআইনি ভাবে অর্থ উপার্জন করে থাকতে পারেন। এবার একই ধরনের কারচুপির মাধ্যমে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের টাকাও হাতানোর চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে বলে তাঁর সন্দেহ।
ফলে শুধু ভুয়ো ডিগ্রি বা বেআইনি রেজিস্ট্রেশনের অভিযোগেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকছে না। রাজ্যজুড়ে এমন কতজন চিকিৎসক রয়েছেন, তাঁদের ডিগ্রি ও রেজিস্ট্রেশন কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল এবং মেডিক্যাল কাউন্সিলের নথিতে কীভাবে তাঁদের নাম উঠল—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এই চক্রের পরিধি এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা স্পষ্ট হতে পারে।
