আমদাবাদ— বিশ্ব প্যারা তিরন্দাজি সিরিজের আমদাবাদ পর্বে দুরন্ত ছন্দে রয়েছেন ভারতের শীতল দেবী। মিশ্র দলগত যোগ্যতা অর্জন পর্বে বিশ্বরেকর্ড ভাঙার পর এবার ব্যক্তিগত বিভাগেও সোনার পদকের লড়াইয়ে জায়গা করে নিয়েছেন ভারতের এই তারকা প্যারা তিরন্দাজ। মহিলাদের কম্পাউন্ড বিভাগে ফাইনালে উঠেছেন তিনি।
শীতল ও ভারতের আর এক তিরন্দাজ রাকেশ কুমার মিলে মিশ্র দলগত যোগ্যতা অর্জন পর্বে ১৪০০ পয়েন্ট সংগ্রহ করে নিজেদেরই বিশ্বরেকর্ড ভেঙেছেন। প্যারিস প্যারালিম্পিক্সে ১৩৯৯ পয়েন্ট করে যে বিশ্বরেকর্ড তাঁরা গড়েছিলেন, আমদাবাদে তার চেয়ে এক পয়েন্ট বেশি তুলে নতুন নজির তৈরি করেন তাঁরা।
দলগত সাফল্যের পর ব্যক্তিগত লড়াইয়েও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখেন শীতল। মহিলাদের কম্পাউন্ড বিভাগের র্যাঙ্কিং পর্বে সবার উপরে থেকে সরাসরি নকআউট পর্বে জায়গা করে নেন তিনি। সেমিফাইনালে সতীর্থ সরিতাকে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেন শীতল।

সোনার পদকের লড়াইয়ে এবার তাঁর সামনে কাজাখস্তানের আইজাদা সাইদান। যোগ্যতা অর্জন পর্বে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন কাজাখ তিরন্দাজ। ফলে ফাইনালে শীতল এবং সাইদানের লড়াই ঘিরে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা।
অন্য দিকে, সরিতার সামনে রয়েছে ব্রোঞ্জ জয়ের সুযোগ। ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে তাঁকে মুখোমুখি হতে হবে চিনের ওয়াং হুইটিংয়ের।
শীতলের এই পারফরম্যান্স ভারতের প্যারা ক্রীড়াক্ষেত্রে তাঁর ক্রমবর্ধমান সাফল্যের ধারাকেই আরও শক্তিশালী করছে। অল্প সময়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি। আমদাবাদে ব্যক্তিগত সোনা জিততে পারলে তাঁর আন্তর্জাতিক সাফল্যের তালিকায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হবে।
তবে সব ভারতীয় তিরন্দাজের দিন অবশ্য একই রকম কাটেনি। পুরুষদের কম্পাউন্ড বিভাগে টোমান সিং ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে পৌঁছেছেন। সেখানে তাঁর প্রতিপক্ষ ইরাকের কাজিম আব্বাস। এই আব্বাসই শেষ ষোলোয় ভারতের রাকেশ কুমারকে হারিয়ে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে দেন। র্যাঙ্কিং পর্বে দ্বিতীয় স্থানে থাকা রাকেশের অভিযান তাই শেষ হয়েছে শেষ ষোলোতেই।
পুরুষদের রিকার্ভ বিভাগে ভারতের জন্য দিনটি ছিল কঠিন। যোগ্যতা অর্জন পর্বে তৃতীয় স্থানে থাকা গুরবিন্দর সিং প্রথম রাউন্ডে সরাসরি পরের পর্বে উঠেছিলেন। কিন্তু শেষ ষোলোয় চিনের গান জুনের কাছে হেরে তাঁর অভিযান শেষ হয়।
সেহজবীর সিংও প্রথম রাউন্ডে সরাসরি পরের পর্বে উঠেছিলেন। কিন্তু শেষ ষোলোয় স্লোভাকিয়ার ইভান ডেভিডের কাছে হেরে যান তিনি। পিআরএম বিভাগে ভারতের পরভীন এবং সুন্দি বিজয়ও শেষ ষোলো পেরোতে পারেননি।
মহিলাদের প্যারা রিকার্ভ বিভাগে অবশ্য ভারতীয়দের জন্য পদকের লড়াইয়ে জায়গা রয়েছে। যোগ্যতা অর্জন পর্বে তৃতীয় স্থানে থাকা ভাবনা সেমিফাইনালে পৌঁছেছিলেন। সেখানে ইরানের দ্বিতীয় বাছাই সোমায়েহ রহিমি গাহদেরিজানির কাছে হারেন তিনি। ফলে ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে তাঁর প্রতিপক্ষ হয়েছেন ভারতেরই রাজশ্রী ধনরাজ রাঠৌড়।
রাজশ্রী শেষ ষোলোয় সতীর্থ পুজাকে অল্প ব্যবধানে হারিয়ে পরের পর্বে উঠেছিলেন। পরবর্তী নকআউট পর্ব পেরিয়ে তিনি এখন ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। ফলে এই বিভাগে একটি পদক ভারতের হাতে নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পুরুষদের ডব্লিউ ওয়ান বিভাগেও ভারতের কয়েকজন তিরন্দাজ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। আদিল মহম্মদ নাজির আনসারি সেমিফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হন। তাঁকে হারান চেকিয়ার ডেভিড দ্রাহোনিনস্কি। নুরউদ্দিন, নবীন দলাল এবং বিনায়ক অমল ব্রিডও শেষ ষোলোয় পরাজিত হয়ে বিদায় নিয়েছেন।
মহিলাদের ডব্লিউ ওয়ান বিভাগে অবশ্য ভারতের পদকের আশা এখনও টিকে রয়েছে। স্বাতী চৌধুরী ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে পৌঁছেছেন। ব্রোঞ্জের ম্যাচে তাঁর প্রতিপক্ষ রাশিয়ার এলেনা ক্রুতোভা।
অঞ্জুম তানওয়ার এবং শ্রিয়া যোশী শেষ ষোলোয় হেরে যান। বসুন্ধরা তেওতিয়া কোয়ার্টার ফাইনালে পরাজিত হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নেন।
দৃষ্টিহীন তিরন্দাজদের বিভাগেও ভারতের একাধিক প্রতিযোগী শেষ দিকের লড়াইয়ে রয়েছেন। শীর্ষ বাছাই ক্রিস্টোস মিসোস একমাত্র বিদেশি তিরন্দাজ হিসেবে ভারতের যুগল গর্গের মুখোমুখি হবেন। এই ম্যাচের জয়ী সোনার পদকের লড়াইয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
অন্য একটি ম্যাচে মুখোমুখি হবেন ভারতেরই পবন কুমার এবং তানভি প্রবীণ ইঙ্গালে। এই লড়াইও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জয়ী তিরন্দাজ সোনার লড়াইয়ের দিকে এগিয়ে যাবেন এবং পরাজিত প্রতিযোগীর সামনে ব্রোঞ্জ জয়ের সুযোগ থাকবে।
কোয়াড্রুপল প্যারা তিরন্দাজি বিভাগে ভারতের পায়েল নাগ অবশ্য শেষ ষোলোয় উঠতে পারেননি। চিনের হুইটিংয়ের কাছে হেরে তাঁর প্রতিযোগিতা শেষ হয়। লালপাইও প্রথম রাউন্ডে সরাসরি পরের পর্বে উঠেছিলেন, কিন্তু শেষ ষোলোয় পরাজিত হন।
আমদাবাদে প্রতিযোগিতার আয়োজনও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসা পেয়েছে। বিশ্বের ১৯টি দেশের ১০৮ জন তিরন্দাজ এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। ভুটান, ব্রিটেন, চিন, বাংলাদেশ, ফ্রান্স, জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া এবং আমেরিকা-সহ একাধিক দেশের প্রতিযোগীরা অংশ নিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ব প্যারা তিরন্দাজি সিরিজের আমদাবাদ পর্বের উদ্বোধন করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের জন্য আমদাবাদের পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।
গুজরাতে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া পরিকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি ক্রীড়া প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া সরঞ্জাম ও প্রকৌশল, ক্রীড়া চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের মতো ক্ষেত্রেও ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
আমদাবাদ আগামী দিনে আরও বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের দিকে এগোচ্ছে। ২০৩০ সালের কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের পরিকল্পনার পাশাপাশি ২০৩৬ সালের অলিম্পিক্স আয়োজনের জন্যও শহরটির আগ্রহ রয়েছে।
তবে আপাতত আমদাবাদের মঞ্চে ভারতের নজর তিরন্দাজদের দিকেই। শীতল দেবী সোনার লড়াইয়ে, টোমান সিং এবং স্বাতী চৌধুরী ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে এবং আরও কয়েকজন ভারতীয় পদকের দৌড়ে থাকায় প্রতিযোগিতার শেষ পর্বে ভারতের প্রত্যাশা যথেষ্ট উজ্জ্বল।
