নিজস্ব প্রতিনিধি— তারাপীঠের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ন’জনের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় আরও একটি হোটেলে ভয়াবহ আগুন। বুধবার মাঝরাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি পুরনো বহুতলে আগুন লাগে। ঘটনায় ন’জনের মৃত্যু হয়েছে। মর্মান্তিক এই ঘটনায় গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন তিনি।
সমাজমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় প্রধানমন্ত্রী জানান, কলকাতার অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির খবর তাঁকে গভীর ভাবে ব্যথিত করেছে। যাঁরা তাঁদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে আহতদের দ্রুত সুস্থতার প্রার্থনা করেছেন। উদ্ধারকাজে স্থানীয় প্রশাসনের তরফে যে সাহায্য করা হয়েছে, তার কথাও উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
অগ্নিকাণ্ডের পর সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই বহুতলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, একই ভবনের বিভিন্ন তলায় একাধিক হোটেল চলছিল। সেখানে মোট ছ’টি হোটেলের বোর্ড ছিল বলে জানা যাচ্ছে। পুরনো ওই ভবনের ভিতরের পরিকাঠামোও অত্যন্ত ঘিঞ্জি ছিল।

ভবনটির মূল প্রবেশপথ খুবই সরু। প্রায় পাঁচ ফুট চওড়া সেই পথ দিয়ে একসঙ্গে বহু মানুষের বেরিয়ে আসা কঠিন। ভিতরে রয়েছে একের পর এক ছোট ঘর। পাঁচতলা ভবনে ওঠার জন্য রয়েছে সরু ও বেঁকানো লোহার সিঁড়ি। সামনের প্যাসেজও প্রায় দেড় ফুট চওড়া বলে জানা গিয়েছে। ফলে আগুন বা ধোঁয়ার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে ভিতরে থাকা মানুষজনের দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসার সুযোগ কতটা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভিযোগ, ভবনটিতে জরুরি অবস্থায় ব্যবহারের জন্য আলাদা অগ্নিনির্গমন পথও ছিল না। আগুন লাগার পর ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ঘিঞ্জি ঘর এবং সরু পথের কারণে ভিতরে থাকা মানুষজন বিপাকে পড়েন বলে প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে। আগুনের তীব্রতার পাশাপাশি ভবনের পরিকাঠামোও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়েছে কি না, সেটি এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এমন একটি ভবনে কী ভাবে একাধিক হোটেল চলছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গেও এই ঘটনা নিয়ে তাঁর আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। হোটেলগুলির অনুমোদন এবং অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আগুন লাগার সঠিক কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। প্রাথমিক ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংযোগে গোলযোগ থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তবে শুধু আগুনের উৎস নয়, ভবনের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, জরুরি নির্গমনপথ এবং হোটেল চালানোর অনুমোদনও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
ঘটনার পর ফের সামনে এসেছে কলকাতার হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা অডিটের পুরনো প্রসঙ্গ। এর আগে জোড়াসাঁকোর একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের পর শহরের হোটেলগুলিতে নিরাপত্তার নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য অডিট কমিটি তৈরি হয়েছিল। কয়েকটি বৈঠকের পর সেই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি বলে জানা যাচ্ছে। নিউমার্কেটের ঘটনার পর ফের নতুন করে হোটেলগুলির নিরাপত্তা পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, কলকাতা শহরে প্রায় ৩ হাজার ৭৮৮টি হোটেল রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত কর্মী না থাকায় আগের উদ্যোগে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি হোটেলের অডিট করা সম্ভব হয়েছিল বলে দাবি। সেই অডিটের রিপোর্ট শেষ পর্যন্ত পুরসভা বা দমকল দপ্তরের কাছে জমা পড়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে নিউমার্কেট থানায় ঘটনায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফরেন্সিক দল বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেছে। আগুনের সূত্রপাত কোথা থেকে, কত দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মৃতদের মধ্যে ঝাড়খণ্ডের এক বাসিন্দার পরিচয় জানা গিয়েছে। অন্যদের পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়াও চলছে। তারাপীঠের পর নিউমার্কেটের হোটেলে পরপর অগ্নিকাণ্ড এবং প্রাণহানির ঘটনায় শহরের হোটেলগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন তদন্তের পাশাপাশি নিয়ম না মেনে হোটেল চালানোর অভিযোগ সত্যি কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছে প্রশাসন।
