নিজস্ব প্রতিনিধি— অনলাইন গেমিং অ্যাপকে ব্যবহার করে তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি এবং তাঁদের জঙ্গি সংগঠনে টানার চেষ্টা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে কেন্দ্র ও রাজ্যের নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। গোয়েন্দাদের দাবি, ভারতীয় উপমহাদেশের আল কায়েদা বা ‘আকিস’-এর সঙ্গে যুক্ত একটি নেটওয়ার্ক পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে থাকতে পারে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা-সহ অন্তত ছয়টি জেলায় এই যোগাযোগের সূত্র পাওয়া গিয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি।
সম্প্রতি দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় ও নোদাখালি থেকে দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তে নতুন কিছু তথ্য সামনে এসেছে। সোমবার বিজয়গঞ্জ বাজার এবং নোদাখালি এলাকায় তেলেঙ্গানা পুলিশ ও রাজ্য পুলিশের বিশেষ বাহিনী যৌথ অভিযান চালায়। সেই অভিযানে জিন্নাতুল কিবরিয়া ওরফে টুটুল বেগ এবং মহম্মদ সফিক শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং বৈদ্যুতিন নথি খতিয়ে দেখে গোয়েন্দারা সম্ভাব্য যোগাযোগের পরিধি বোঝার চেষ্টা করছেন।
তদন্তকারীদের দাবি, অনলাইন গেমিংয়ের মাধ্যমে প্রথমে তরুণদের সঙ্গে পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা করা হত। গেম খেলার সময় কোনও ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হওয়ার পর ধাপে ধাপে সেই সম্পর্ককে অন্য যোগাযোগমাধ্যমে নিয়ে যাওয়া হত বলে সন্দেহ। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এর পরে নির্দিষ্ট সামাজিকমাধ্যমের গোষ্ঠী এবং অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে উগ্রপন্থী মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে তদন্তের এই পর্যায়ে অনলাইন গেমিং অ্যাপ ব্যবহারকারী প্রত্যেক তরুণের সঙ্গে জঙ্গি যোগাযোগ রয়েছে, এমন কোনও দাবি করা হচ্ছে না। বরং গোয়েন্দাদের নজর নির্দিষ্ট কয়েকটি যোগাযোগের দিকে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কারা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত, কী ধরনের বার্তা আদানপ্রদান হত এবং সেই যোগাযোগের পিছনে অন্য কোনও ব্যক্তি বা সংগঠন ছিল কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে।
গোয়েন্দাদের দাবি, তরুণদের প্রভাবিত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রচারমূলক উপাদান ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। জাতীয় প্রতীক এবং দেশাত্মবোধক বিষয়কে বিকৃত ভাবে তুলে ধরা, উগ্রপন্থী সংগঠনের প্রচারসামগ্রী ছড়িয়ে দেওয়া এবং হিংসাত্মক ভিডিয়ো দেখানোর অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে। জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতকে অবমাননাকর ভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের নজরে পাকিস্তান থেকে পরিচালিত কয়েকটি সামাজিকমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ও গোষ্ঠীও এসেছে বলে সূত্রের খবর। ধৃত দুই ব্যক্তির সঙ্গে বিদেশে থাকা কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর যোগাযোগ ছিল কি না, বিশেষ করে পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের সঙ্গে তাঁদের কোনও সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। বৈদ্যুতিন যন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্য এবং যোগাযোগের নথি এই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে বাঁকুড়া-সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে ‘আকিস’-এর সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগে কয়েক জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সেই তদন্তের সঙ্গে ভাঙড় ও নোদাখালির সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারের কোনও যোগ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজ্যে যোগাযোগ তৈরি করা হয়েছিল কি না, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
গোয়েন্দাদের প্রাথমিক সন্দেহের তালিকায় দক্ষিণ ২৪ পরগনা ছাড়াও উত্তর ২৪ পরগনা, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া এবং বীরভূম রয়েছে। এই জেলাগুলিতে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের যোগাযোগ বা সহায়তার কোনও সূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত এই ছয় জেলার সব জায়গায় সংগঠনের সক্রিয় নেটওয়ার্ক রয়েছে বলে নিশ্চিত করে কোনও তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
তদন্তের পরবর্তী ধাপে ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাঁদের ব্যবহৃত বৈদ্যুতিন যন্ত্রের তথ্য বিশ্লেষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত, যোগাযোগের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং তরুণদের মধ্যে কাউকে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
previous post
