August 18, 2026
রাজ্য

বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার পদ নিয়ে হাইকোর্টের রায়, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বীকৃতি ঘিরে জটিলতা

সংবাদ কলকাতা— বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের রায় ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে তীব্র আগ্রহ। স্পিকার রথীন্দ্র বসুর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের করা মামলায় শুনানি শেষ হলেও এতদিন রায়দান স্থগিত রেখেছিল বিচারপতি শম্পা সরকার ও বিচারপতি অজয় দাশগুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চ।

বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরই সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনি প্রশ্ন ওঠে। তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় আদালতের দ্বারস্থ হন। তাঁর হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। মামলাকারীর দাবি ছিল, কোনও রাজনৈতিক দলের পরিষদীয় দলের নেতা কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলই নেবে। স্পিকারের একতরফাভাবে কোনও ব্যক্তিকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ নেই।

শুনানিতে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় যুক্তি দেন, রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তই প্রাথমিক। তাঁর বক্তব্য, ‘দলই ঠিক করবে কে পরিষদীয় দলের নেতা হবেন। স্পিকারের কাছে রাজনৈতিক দলের প্রস্তাব গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই।’ রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে স্পিকার অন্য কোনও ব্যক্তিকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেন কি না, সেই প্রশ্নও আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়।

অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল জানান, ৫৮ জন বিধায়ক স্বাক্ষর করে ঋতব্রতকে পরিষদীয় দলের নেতা হিসেবে প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন যখন নথির মাধ্যমে স্পষ্ট, তখন স্পিকারের সামনে সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া কার্যত অন্য কোনও বিকল্প ছিল না।

মামলার শুনানিতে স্পিকার প্রথম কবে বিরোধী দলনেতা সংক্রান্ত চিঠি পেয়েছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে আদালত। জানানো হয়, ৯ মে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই সময় স্পিকার নির্বাচিত হননি। পরে ১৫ মে স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯ মে আরও একটি চিঠি জমা পড়ে। ওই চিঠিতে ১৮ মে সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণের দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু আদালতে জানানো হয়, সেই বৈঠক বাস্তবে হয়নি।

এরপর বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রথম প্রস্তাবে যে স্বাক্ষরগুলি ছিল, তার কয়েকটি জাল বলে অভিযোগ ওঠে। সেই অভিযোগও স্পিকারের কাছে জমা পড়ে। পরবর্তী সময়ে ৩ জুন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

মামলাকারীর আইনজীবী আদালতে অভিযোগ করেন, ‘সবাইকে অন্ধকারে রেখে বিরোধী দলনেতা নিয়োগ করা যায় না। ওই চেয়ারে বসে পক্ষপাত করা যায় না।’ স্পিকারের সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল, সেই প্রশ্নও তোলা হয়।

তবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী জয়দীপ কর পাল্টা যুক্তি দেন, ৫৮ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৬ জন স্পিকারকে চিঠি দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন। বাকি দু’জন পরবর্তী সময়ে তাঁদের সম্মতি জানান। তাঁর বক্তব্য, স্পিকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়টি যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একজন বিধায়ক হওয়া এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন থাকা—এই দুই শর্ত পূরণ হলেই বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে স্পিকারের সিদ্ধান্তে কোনও ত্রুটি নেই বলেই দাবি করেন তিনি।

শুনানিতে বেঞ্চও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। ৩ জুন নতুন করে আবেদন জমা দেওয়ার পর একই দলের দ্বিতীয় চিঠি কেন গ্রহণ করা হল, তা জানতে চায় আদালত। স্পিকারের আইনজীবীর তরফে জানানো হয়, প্রথম রেজলিউশনের সময় কয়েকজন বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন না এবং তাঁদের স্বাক্ষর জাল হওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। সেই কারণেই পরবর্তী প্রক্রিয়ায় নতুন নথি বিবেচনা করা হয় বলে আদালতে জানানো হয়।

এরপর আদালত জানতে চায়, স্বাক্ষর জাল হওয়ার অভিযোগের কোনও যাচাই হয়েছিল কি না। শুনানিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবিও প্রশ্নের মুখে পড়ে। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, ‘৫৮ বেশি, না ৭৮ বেশি—কোনটা ঠিক?’ অর্থাৎ কোন নথি ও কোন সংখ্যাকে বৈধ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

মামলার শুনানিতে মহারাষ্ট্রের একনাথ শিন্ডে বনাম উদ্ধব ঠাকরে মামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর যুক্তি, রাজনৈতিক দলই প্রথম, পরিষদীয় দল তার পরে। রাজনৈতিক দল যাঁকে নেতা হিসেবে মনোনীত করবে, বিধানসভায় সেই সিদ্ধান্তই কার্যকর হওয়া উচিত। একই রাজনৈতিক দলের মধ্যে পৃথক গোষ্ঠীর দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য, সেই প্রশ্নও তিনি তোলেন।

এই মামলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে বিধানসভার আসন্ন অধিবেশনকে ঘিরে। আদালতে দাবি করা হয়েছে, হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ না দিলে স্পিকার অন্য কোনও গোষ্ঠীকে বৈঠকে ডাকবেন না। ফলে আদালতের রায় সরাসরি বিধানসভায় বিরোধী দলের নেতৃত্বের অবস্থান এবং পরিষদীয় কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।

এখন হাইকোর্টের রায়ের দিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের। আদালত স্পিকারের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে, নাকি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়ে নতুন নির্দেশ দেয়, তা স্পষ্ট হলেই বিধানসভায় বিরোধী দলের নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের জট কাটবে।

Related posts

Leave a Comment