সংবাদ কলকাতা— এসআইআর-এর আবহে ২০১১ সাল থেকে ভোটার কার্ডের ভিত্তিতে ইস্যু হওয়া জাতিগত শংসাপত্র পুনঃযাচাইয়ের রাজ্য নির্দেশ ঘিরে বড় প্রশ্ন উঠল কলকাতা হাইকোর্টে। মঙ্গলবার মামলার শুনানিতে রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল জানান, ভোটার কার্ডের ভিত্তিতে ইস্যু হওয়া ওই শংসাপত্রগুলি পুনঃযাচাই করা হবে। তবে প্যান কার্ড বা অন্য কোনও নথির ভিত্তিতে নেওয়া জাতিগত শংসাপত্রের ক্ষেত্রে একইভাবে পুনঃযাচাইয়ের প্রয়োজন নেই বলেও আদালতে স্পষ্ট করেন তিনি।
রাজ্যের এই ‘গণপুনঃযাচাই’ সংক্রান্ত নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছে সিপিএম। মামলাকারীর হয়ে প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য আদালতে সওয়াল করেন, কোনও নির্দিষ্ট শংসাপত্র নিয়ে অভিযোগ উঠলে তদন্ত বা পুনঃযাচাই করা যেতে পারে। কিন্তু ২০১১ সাল থেকে ইস্যু হওয়া সমস্ত জাতিগত শংসাপত্রকে একসঙ্গে পুনঃযাচাইয়ের আওতায় আনার নির্দেশ আইনসম্মত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, এ ধরনের ব্যাপক পুনঃযাচাইয়ের সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুনানির সময় আদালতও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। এসআইআরে কোনও ব্যক্তির নাম বাদ পড়লে সেটি কি তাঁর জাতিগত শংসাপত্র পুনঃযাচাইয়ের আইনসম্মত ভিত্তি হতে পারে, জানতে চায় ডিভিশন বেঞ্চ। জবাবে রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল জানান, এসআইআরে কারও নাম বাদ পড়েছে মানেই তাঁর জাতিগত শংসাপত্র বাতিল হয়ে যাবে, এমনটা নয়।
বে আদালতের পর্যবেক্ষণ, জাতিগত শংসাপত্র বাতিল বা বাজেয়াপ্ত করার জন্য আইনে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। কোনও নতুন প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে সেই নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ২০১১ সাল থেকে ইস্যু হওয়া শংসাপত্রগুলি যাচাই করা হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রে আইন মেনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে আদালত স্পষ্ট করেছে।
একই সঙ্গে আদালত এটাও ইঙ্গিত করেছে যে পুরো নির্দেশিকা একেবারে স্থগিত করে দিলে প্রকৃত ভুয়ো জাতিগত শংসাপত্রের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। ফলে ভুয়ো শংসাপত্র চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয়তা এবং নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া মেনে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে আসে, বিভিন্ন সাব-ডিভিশনাল অফিসারদের বৈঠকের ভিত্তিতে ২০১১ সাল থেকে ইস্যু হওয়া জাতিগত শংসাপত্র পুনঃযাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। এর ফলে প্রশাসনিক আধিকারিকদের উপর উপরমহলের নির্দেশ কার্যকর করার চাপ তৈরি হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
জাতিগত শংসাপত্র বাতিল বা বাজেয়াপ্ত করার ক্ষেত্রে নতুন কোনও ভিত্তি যুক্ত করে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও আদালতে প্রশ্ন ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট মেমো মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি অতরুপ বন্দোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ।
ফলে এসআইআর-এর সঙ্গে জাতিগত শংসাপত্র পুনঃযাচাইয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসঙ্গত এবং তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া কতটা মানা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন এখন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারাধীন। মামলার পরবর্তী শুনানিতে এই বিষয়ে আরও স্পষ্ট নির্দেশ আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
