দিল্লি: আয়ুষ্মান ভারত (Ayushman Bharat) স্বাস্থ্য প্রকল্পে অনিয়ম ও প্রতারণা ঠেকাতে বড়সড় পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে ২৯টি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত হাসপাতালগুলির কাছ থেকে ৩২৮.৪৯ কোটি টাকা জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনিয়মের অভিযোগে দেশের ২৩৫৯টি হাসপাতালকে প্রকল্পের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আরও ১২০০টি হাসপাতালকে সাময়িক ভাবে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
লোকসভায় লিখিত জবাবে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা (J P Nadda) এই তথ্য জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন-আরোগ্য যোজনা (PM-JAY)-র নিয়ম মেনে না চলার অভিযোগের ভিত্তিতেই হাসপাতালগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কোনও হাসপাতাল তালিকা থেকে বাদ পড়লে সেখানে আয়ুষ্মান ভারতের অধীনে নগদহীন চিকিৎসা (Cashless Treatment) পাওয়া যাবে না। একই নিয়ম সাসপেন্ড হওয়া হাসপাতালের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাই প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়ার আগে সরকারি তালিকায় সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের নাম রয়েছে কি না, তা দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প ২০১৮ সালে চালু করে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) নেতৃত্বাধীন সরকারের এই প্রকল্পের অধীনে যোগ্য পরিবারকে বছরে সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া হয়। দেশের বিপুল সংখ্যক দরিদ্র ও প্রয়োজনীয় পরিবারকে বড় চিকিৎসা খরচের চাপ থেকে রক্ষা করাই এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।
জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের (National Health Authority) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৮ আগস্ট পর্যন্ত আয়ুষ্মান ভারতের তালিকায় মোট ৩৪ হাজার ৪৩৭টি হাসপাতাল রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ২০ হাজার ৩৬৩ এবং বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে ১৮ হাজার ৭৪টি।

বিপুল সংখ্যক হাসপাতাল ও উপভোক্তার এই ব্যবস্থায় অনিয়ম ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির উপরও জোর দিচ্ছে কেন্দ্র। জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) এবং যন্ত্রশিক্ষা (Machine Learning) প্রযুক্তি ব্যবহার করে সন্দেহজনক চিকিৎসা দাবি শনাক্ত করছে।
ভুয়ো বিল (Fake Bills), একই চিকিৎসার জন্য একাধিক বার দাবি জমা বা পুনরাবৃত্ত দাবি (Duplicate Claims), ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে প্রকল্পের সুবিধা নেওয়া— এই ধরনের প্রতারণা শনাক্ত করতেই প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। কেন্দ্রের দাবি, কোনও হাসপাতাল টাকা দাবি করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহজনক দাবি চিহ্নিত করার ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
জাল বা অনিয়মিত দাবি শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকে টাকা দেওয়ার আগেই সেই দাবি আটকে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সরকারি অর্থের অপচয় ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে বলে কেন্দ্রের দাবি। ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে ৬৭৬.১৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি আটকানো হয়েছে বলেও জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

কেন্দ্রের এই পদক্ষেপের ফলে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে যুক্ত হাসপাতালগুলির উপর নজরদারি আরও কঠোর হয়েছে। বিশেষ করে ভুয়ো চিকিৎসার দাবি, বেআইনি বিল এবং প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের মতো অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু হাসপাতালকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া নয়, প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপও করা হচ্ছে।
সাধারণ উপভোক্তাদের কাছে এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব যথেষ্ট। কারণ আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা নিতে গিয়ে কোনও ব্যক্তি যদি এমন হাসপাতালে পৌঁছে যান, যেটি ইতিমধ্যে প্রকল্পের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বা সাসপেন্ড হয়েছে, তা হলে সেখানে এই প্রকল্পের আওতায় নগদহীন চিকিৎসা নাও মিলতে পারে।
তাই চিকিৎসার আগে হাসপাতালের বর্তমান অবস্থান যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। কেন্দ্রের দাবি, অনিয়মকারী হাসপাতালগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তির মাধ্যমে ভুয়ো দাবি আটকে দিয়ে প্রকল্পের অর্থ সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হল আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা যেন প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছেই পৌঁছয় এবং সরকারি অর্থ যেন প্রতারণার মাধ্যমে অন্যত্র চলে না যায়।

এফআইআর, জরিমানা, হাসপাতাল বাদ দেওয়া এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি— একাধিক স্তরে ব্যবস্থা নিয়ে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে স্বচ্ছতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে কেন্দ্র। ফলে ভবিষ্যতে প্রকল্পের অধীনে হাসপাতালগুলির কাজকর্ম এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত আর্থিক দাবির উপর নজরদারি আরও বাড়তে পারে।
