কলকাতা— ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কারাবন্দি হওয়া ‘লোকতন্ত্র সেনানী’দের সম্মান জানিয়ে বড় ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। রবিবার নবান্নে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে মোট ৩২৫ জন লোকতন্ত্র সেনানীকে সংবর্ধনা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সম্মানিক ভাতা, সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত এবং সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য বিশেষ সহায়তার ঘোষণা করেন তিনি।
রাজ্য সরকারের বক্তব্য, ক্ষমতায় আসার ৯০ দিনের মধ্যেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কার্যকর করা হচ্ছে। জরুরি অবস্থার সময় গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে অংশ নিয়ে যাঁরা জেলে গিয়েছিলেন, তাঁদের দীর্ঘ লড়াই ও ত্যাগকে স্বীকৃতি দিতেই এই সুবিধাগুলি চালু করা হচ্ছে।

নবান্নের অনুষ্ঠানে জানানো হয়েছে, সম্মানিত ৩২৫ জন লোকতন্ত্র সেনানীকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে সম্মানিক ভাতা দেওয়া হবে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য তাঁদের ১ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। কোনও সম্মানিত লোকতন্ত্র সেনানী ইতিমধ্যে মারা গিয়ে থাকলে তাঁর স্ত্রী বা স্বামী এই সুবিধাগুলি পাওয়ার অধিকারী হবেন বলে জানানো হয়েছে।
শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, লোকতন্ত্র সেনানীদের জন্য সরকারি বাসে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে যাতায়াতের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তাপস রায় এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতিতে লোকতন্ত্র সেনানীদের হাতে তাম্রপদক ও সম্মান তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন দেশে জরুরি অবস্থা জারির সময়কার পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, সেই সময় গোটা দেশে প্রায় এক লক্ষ মানুষকে জেলে পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ ছিলেন বলে জানান তিনি।
শুভেন্দুর বক্তব্য, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধের সেই সময়েও যাঁরা প্রতিবাদ করেছিলেন এবং কারাবরণ করেছিলেন, তাঁদের ত্যাগের কারণেই আজ দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র এবং ভোটাধিকার সুরক্ষিত রয়েছে। তাঁদের আন্দোলনকে গণতন্ত্র রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেও তুলে ধরেন তিনি।

এদিনের অনুষ্ঠানে অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, বাম এবং আগের তৃণমূল সরকারের সময়ে রাষ্ট্রবাদ ও ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদানকে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে। বর্তমান প্রজন্মকে সেই ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য রাজ্য সরকারের পরিকল্পনার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। আগামী ১৩ তারিখ সচিবালয়ে মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন তিনি।
ওই কমিটির মাধ্যমে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শ এবং বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলি সঠিক ভাবে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘বিকাশ ভি হোগা, বিরাসাত ভি হোগা’ মন্ত্রের কথাও তুলে ধরেন শুভেন্দু। ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ এবং তেরঙ্গা যাত্রার মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্য, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং জাতীয় চেতনার প্রতি সম্মান জানানোর উপর জোর দেন তিনি।লোকতন্ত্র সেনানী সঙ্ঘের দীর্ঘ
আন্দোলনের প্রশংসা করে ভবিষ্যতেও তাঁদের গঠনমূলক পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সরকারের এই সিদ্ধান্তে জরুরি অবস্থার সময় আন্দোলন করে কারাবন্দি হওয়া ব্যক্তিদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং তাঁদের সামাজিক স্বীকৃতির বিষয়টি নতুন করে সামনে এল। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি তাঁদের সম্মান জানানোর এই উদ্যোগকে সরকারের পক্ষ থেকে গণতন্ত্র রক্ষার ইতিহাসকে সামনে আনার পদক্ষেপ হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।
