পূর্ব বর্ধমান — গৃহস্থের ঘরের কোণে, দরজার ফাঁকে কিংবা খাটের তলায় হঠাৎ বিষধর কেউটে সাপের দেখা মিললে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ারই কথা। কিন্তু পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোট ব্লকের পলসোনা গ্রামে ছবিটা একেবারেই আলাদা। এখানে কেউটে সাপকে ভয় নয়, দেবীর আসনে বসিয়ে ‘মা ঝঙ্কেশ্বরী’ হিসেবে পুজো করা হয়। শুধু তাই নয়, পুজোর দিন জলজ্যান্ত বিষধর সাপকে হাতে তুলে নিয়ে চলে আরাধনা। বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই বিরল ধর্মীয় ঐতিহ্য আজও সমানভাবে পালন করে চলেছেন গ্রামের মানুষ।
প্রতি বছর গুরুপূর্ণিমার পরের দিন মহাসমারোহে আয়োজিত হয় মা ঝঙ্কেশ্বরীর পুজো। গ্রামে যে জায়গায় বিষধর কেউটের দেখা মেলে, সেখান থেকেই সাপটিকে নিয়ে আসা হয়। গঙ্গাজল দিয়ে স্নান করানো, হলুদ মাখানো এবং অন্যান্য ধর্মীয় আচার পালনের মাধ্যমে দেবীরূপে তাঁর পুজো করা হয়। মূর্তি নয়, জীবন্ত বিষধর সাপকেই এখানে দেবীর প্রতীক হিসেবে আরাধনা করা হয়।
তবে এই পুজো কেবল একটি দিনের অনুষ্ঠান নয়। বছরের অন্য সময়েও গ্রামবাসীর সঙ্গে বিষধর সাপের সহাবস্থান এই গ্রামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাড়ির উঠোন, রান্নাঘর, দরজার পাশে কিংবা খাটের নিচে সাপ দেখা গেলেও আতঙ্ক ছড়ায় না। ছোটবেলা থেকেই এমন পরিবেশে বড় হওয়ায় গ্রামবাসীদের কাছে সাপ পরিবারেরই এক সদস্যের মতো।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শৈশব থেকেই তাঁরা ‘মা ঝঙ্কেশ্বরী’র সান্নিধ্যে বড় হয়েছেন। বাড়িতে সাপ ঢুকলেও তাঁরা ভয় পান না। এমনকি সাপের কারণে সামান্য ক্ষতি হলেও অনেকেই তা দেবীর আশীর্বাদ বা ‘প্রসাদ’ বলে মনে করেন। এই বিশ্বাসই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামের সংস্কৃতির অংশ হয়ে রয়েছে।
গ্রামের প্রবীণদের মতে, তাঁদের পূর্বপুরুষেরাও একইভাবে ঝঙ্কেশ্বরী পুজো করে এসেছেন। তাঁদের বিশ্বাস, মা ঝঙ্কেশ্বরী গোটা গ্রামের রক্ষাকর্ত্রী। সেই কারণেই এই পুজোকে ঘিরে রয়েছে একাধিক লোকাচারও। সন্ধ্যায় গ্রাম পরিক্রমার পর মন্দিরের সামনে মাটির কলস ভাঙার রীতি রয়েছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, সেই কলসের টুকরো বাড়িতে রাখলে বিষধর সাপ আর ঘরে ঢোকে না। অনেকেই এই বিশ্বাসের সঙ্গে মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলা-লখীন্দরের কাহিনির যোগসূত্রও খুঁজে পান।
শুধু পলসোনা নয়, মঙ্গলকোটের ছোটপোষলা, মুসুরি, নিগন এবং ভাতারের বড়পোষলা, শিকোত্তর ও মুকুন্দপুর-সহ মোট সাতটি গ্রামে ঝঙ্কেশ্বরী পুজোর প্রচলন রয়েছে। তবে পলসোনাতেই সাপ ও মানুষের সহাবস্থান সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে বলে দাবি স্থানীয়দের।
ই বিরল ধর্মীয় ঐতিহ্য দেখতে প্রতি বছর দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ ভিড় জমান। পুজোকে কেন্দ্র করে বসে মেলা। কয়েক দিনের জন্য উৎসবের আবহে মেতে ওঠে গোটা এলাকা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। মঙ্গলকোটের বিধায়ক শিশির ঘোষও পুজোয় উপস্থিত থেকে এলাকার শান্তি, সুস্থতা এবং উন্নতির জন্য প্রার্থনা করেন।
তবে এই ঘটনার বৈজ্ঞানিক দিক নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। সর্প বিশেষজ্ঞ ধীমান ভট্টাচার্যের মতে, ‘মা ঝঙ্কেশ্বরী’ হিসেবে পূজিত সাপটি আসলে মনোক্লেড কোবরা বা ন্যাজা কাউথিয়া (Naja kaouthia), যা অত্যন্ত বিষধর প্রজাতির সাপ। তবে সাপের আচরণ অনেকটাই নির্ভর করে পরিবেশ এবং মানুষের ব্যবহার ও প্রতিক্রিয়ার উপর।
ধীমান ভট্টাচার্যের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডিম থেকে বেরোনোর পর ছোট বয়সে এই সাপ তুলনামূলক বেশি আত্মরক্ষামূলক আচরণ করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা অনেকটাই শান্ত হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ যদি সাপকে বিরক্ত না করে বা আক্রমণ না করে, তবে সাপও মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ কম দেখাতে পারে। এই কারণেই পলসোনায় দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে তাঁর মত।
পের দংশনের পর অনেক ক্ষেত্রে বিষের প্রভাব তুলনামূলক কম হওয়ারও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মনোক্লেড কোবরা প্রতিবার সমপরিমাণ বিষ শরীরে প্রবেশ করায় না। পরিস্থিতি অনুযায়ী বিষের মাত্রা কম বা বেশি হতে পারে। কখনও কখনও আত্মরক্ষার জন্য বিষ ছিটিয়ে দেওয়ার পর দংশনের সময় শরীরে তুলনামূলক কম বিষ প্রবেশ করে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কেউটের দংশন নিরাপদ। বিষধর সাপের কামড় প্রাণঘাতী হতে পারে এবং এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা ও অ্যান্টিভেনম নেওয়াই একমাত্র সঠিক পথ বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
বিশ্বাস ও বিজ্ঞানের এই অনন্য সহাবস্থানই পলসোনার ঝঙ্কেশ্বরী পুজোকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। একদিকে গ্রামবাসীর অটুট ধর্মীয় আস্থা, অন্যদিকে সর্প বিশেষজ্ঞদের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা—দুইয়ের মেলবন্ধনেই পূর্ব বর্ধমানের এই বিরল ঐতিহ্য আজও কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।
