28.9 C
Kolkata
July 15, 2026
Featured

চারু মজুমদারকে নতুন দৃষ্টিতে মঞ্চে তুলে ধরল ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’

পোস্টার চিত্র

নজর কাড়ল লীলার চরিত্র

সংবাদ কলকাতা: দীর্ঘদিন ধরেই বৃহৎ ক্যানভাসের, ভাবনাসমৃদ্ধ নাটক মঞ্চস্থ করার ক্ষেত্রে নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করেছে প্রাচ্য(Prachyo) নিউ আলিপুর নাট্যগোষ্ঠী। সেই ধারাবাহিকতায় নাট্যকার চন্দন সেনের (Chandan Sen) লেখা এবং বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Biplab Bandyopadhyay) পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় মঞ্চে এসেছে নতুন প্রযোজনা ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ (Bosonter Bojronirghosh)। ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম বিতর্কিত এবং আলোচিত নেতা চারু মজুমদারের (Charu Majumdar) জীবন, আদর্শ, পারিবারিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক যাত্রাপথকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছে এই নাটক।

এই প্রযোজনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, চারু মজুমদারকে কেবল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে দর্শকের সামনে হাজির করার সচেতন প্রয়াস। নাটকটি মঞ্চে যথেষ্ট সফলতা পেয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১৫টি শো মঞ্চস্থ হয়ে গিয়েছে। আগামী আগস্ট মাসেও মঞ্চস্থ হওয়ার কথা রয়েছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার। এই শোয়ের আয়োজকরা সবাই যে বামপন্থী এমন নয়। তবু তাঁরা এই শোয়ের মাধ্যমে নকশাল আন্দোলনের পুরোনো ইতিহাসকে চর্চায় নিয়ে আসতে চাইছেন।

এই উপস্থাপনা চারু মজুমদারকে একজন রাজনৈতিক নেতার পাশাপাশি একজন স্বামী, পুত্র এবং সাধারণ মানুষ হিসেবেও চিনতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে কমিউনিস্ট রাজনীতিতে (Communist Politics) নারীদের ভূমিকা এবং তাঁদের অবদানের প্রশ্নও নাটকের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

তবে এই শোয়ের মাধ্যমে বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বামপন্থী মতাদর্শের মানুষরা (Communist Politicians) bosonter-bojronirghosh-review-charu-majumdar-prachyoপুনরুজ্জীবনে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

নাটকের শুরু থেকেই স্পষ্ট হয়, নির্মাতাদের লক্ষ্য চারু মজুমদারের রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাপঞ্জি তুলে ধরা নয়, বরং তাঁর ব্যক্তিত্বের সেই মানবিক স্তরগুলিকে দর্শকের সামনে আনা, যা ইতিহাসের প্রচলিত আলোচনায় প্রায়শই আড়ালেই থেকে যায়। সেই কারণেই নকশালবাড়ি আন্দোলন (Naxalbari Movement), তেভাগা আন্দোলন কিংবা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উল্লেখ থাকলেও নাটকের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তাঁর পারিবারিক জীবন, শৈশব, বাবা বীরেশ্বর মজুমদারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং স্ত্রী লীলা সেনগুপ্ত (Lila Sengupta) মজুমদারের সঙ্গে গভীর মানবিক বন্ধনের কাহিনি।

চন্দন সেনের নাট্যরচনায় চারু মজুমদারের জীবনের একাধিক পরিচিত ও অজানা অধ্যায় উঠে এসেছে। শিলিগুড়ি বয়েজ হাইস্কুলে ছাত্রজীবনের একটি ছোট্ট ঘটনা দিয়েই চরিত্রটির মানবিকতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পরীক্ষার আগে নিজের বই দরিদ্র সহপাঠী কানাইকে দিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ কিংবা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও অবনী স্যারের সংলাপ চারু মজুমদারের ব্যক্তিত্বের ভিত নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। একই সঙ্গে বাবা বীরেশ্বর মজুমদারের সঙ্গে তাঁর মতাদর্শগত দ্বন্দ্বও নাটকের অন্যতম শক্তিশালী অংশ হয়ে উঠেছে। গান্ধীবাদী বাবার সংলাপ— ‘যতদিন বাঁচব, তুমি আমার বিরোধী, আমিও তোমার বিরোধী’— রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও বাবা-ছেলের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ককে স্পষ্ট করে তোলে।

নাটকের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায় নিঃসন্দেহে চারু ও লীলার সম্পর্ক। পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী লীলা সেনগুপ্ত কীভাবে চারু মজুমদারের জীবনে প্রবেশ করেন, কীভাবে তাঁদের প্রেম, বিয়ে এবং পরবর্তী সংসারজীবন গড়ে ওঠে, তা অত্যন্ত সংযত অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৫২ সালে তাঁদের বিয়ে, তিন সন্তানের দায়িত্ব, আর্থিক অনটন, অসুস্থ শ্বশুরের দেখভাল এবং দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে লীলার আত্মত্যাগ নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। একই সঙ্গে নাটকটি প্রশ্ন তোলে, নারী স্বাধীনতা এবং সমান অধিকারের কথা বলা রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যেও কেন একজন নারী সহযোদ্ধা শেষ পর্যন্ত সংসারের দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ থেকে যান। চারু মজুমদারের রাজনৈতিক জীবনে লীলার অবদান এবং তাঁর ব্যক্তিগত বঞ্চনার বিষয়টি নাটকে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

নির্দেশক বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিহাসকে নিছক তথ্য হিসেবে উপস্থাপন না করে নাটকীয় ভাষায় জীবন্ত করে তুলেছেন। পুরো নাটক জুড়ে দৃশ্য বিন্যাস, শিল্পীদের চলাফেরা, আলোর ব্যবহার এবং মঞ্চ পরিকল্পনায় রয়েছে সুস্পষ্ট শৃঙ্খলা। হিরণ মিত্রের শৈল্পিক পরামর্শে মঞ্চসজ্জা হয়েছে সংযত অথচ অর্থবহ। পিছনের জালের পর্দায় লাল রঙে লেখা আন্দোলনের স্লোগান, চারু মজুমদারের ভাস্কর্য, মঞ্চে রাখা ধামসা এবং প্রয়োজনমাফিক ব্যবহার করা বিভিন্ন উপকরণ নাটকের আবহকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। রঞ্জিত দেবের মঞ্চ পরিকল্পনা নাটকের সময় ও পরিবেশ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

নাটকে একটি বিশেষ নাট্যকৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত জলপাইগুড়ি জেলারকে। রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনীত এই চরিত্র বর্তমানে চারু মজুমদারের জীবন নিয়ে বই লিখছেন। তিনিই নাটকের কথক এবং সূত্রধর। তাঁর স্মৃতিচারণ ও পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়েই অতীত ও বর্তমানের সংযোগ তৈরি হয়েছে। সেই সূত্রেই উঠে এসেছে নকশালবাড়ি আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, সুশীতল রায়চৌধুরী, সরোজ দত্ত, শান্তি দাশগুপ্ত, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, জ্যোতি বসু এবং উৎপল দত্তের নাটক ‘তীর’-সহ নানা ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ। আন্দোলনের স্লোগান— ‘আধিনাই তেভাগা চাই’, ‘জান দিব, তবু ধান দিব না’, ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’— নাটকের আবহকে আরও তীব্র করে তোলে।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে শতদল চক্রবর্তী (Shatadal Chakraborty) চারু মজুমদারের চরিত্রে অসাধারণ সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। অতিনাটকীয়তা এড়িয়ে তিনি চরিত্রটির দৃঢ়তা, মানবিকতা এবং দ্বন্দ্বকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। লীলার ভূমিকায় দীপান্বিতা চক্রবর্তী (Dipanwita Chakraborty) আবেগ, সংযম এবং অভিনয় দক্ষতার সমন্বয়ে দর্শকের মনে বিশেষ ছাপ ফেলেছেন। তাঁর সংলাপ, অভিব্যক্তি এবং নীরবতার ব্যবহার চরিত্রটিকে গভীরতা দিয়েছে। অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায় (Arghya Mukherjee), রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় (Rajdeep Banerjee) এবং সুপ্রিয় দত্ত (Supriya Dutta) নিজেদের চরিত্রে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায় বাবা বীরেশ্বর মজুমদারের ভূমিকায় স্মরণীয় অভিনয় করেছেন। পাশাপাশি রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রিয় দত্ত, আনন্দ ভট্টাচার্য, ঝুমুর সাহা, প্রকাশ সিংহ রায়, শুভাশিস চক্রবর্তী এবং শোভন রায় চৌধুরীও নিজ নিজ চরিত্রে নাটককে সমৃদ্ধ করেছেন।

নাটকের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল সঙ্গীত, নৃত্য এবং আলোর ব্যবহার। অভিজিৎ আচার্যের সঙ্গীত পরিচালনা, সোমদত্তা ঘোষের নৃত্য পরিকল্পনা এবং সোমেন চক্রবর্তীর আলোকবিন্যাস নাটকের আবেগকে আরও গভীর করেছে। বিশেষ করে ‘আমি খুঁজছি, আমি খুঁজছি, তোমার ঠিকানা’ গানটির ব্যবহার নাটকের শেষ পর্বে বিশেষ আবেদন তৈরি করে। যদিও কয়েকটি জায়গায় গান ও নৃত্যের ব্যবহার কিছুটা সংযত হলে নাটকের গতি আরও নির্মেদ হতে পারত।

‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ শুধুমাত্র চারু মজুমদারের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে নির্মিত নাটক নয়। এটি এক স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষ, এক দাম্পত্য সম্পর্ক, এক রাজনৈতিক সময় এবং ইতিহাসের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা এক নারীর আত্মত্যাগের কাহিনি। একই সঙ্গে এই প্রযোজনা দর্শককে নতুন করে ভাবতে শেখায়— ইতিহাসের প্রতিটি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পেছনেও থাকে এক জটিল, আবেগময় এবং গভীর মানবিক জীবন। সেই কারণেই ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ সাম্প্রতিক বাংলা নাট্যমঞ্চের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজনা হিসেবে সহজেই নিজের জায়গা করে নেয়।

Related posts

Leave a Comment