বারুইপুর: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের সূর্যপুরে গণপিটুনিতে নিহত অটোচালক ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের মৃত্যু কোনও তাৎক্ষণিক জনরোষের ফল নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড। শনিবার নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, নির্বাচনে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির উস্কানির পাশাপাশি এই ঘটনার নেপথ্যে অতিবামপন্থী ও উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীরও হাত থাকতে পারে।
শনিবার বারুইপুরে ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি আশ্বাস দেন, নির্দোষ এক যুবকের হত্যার ঘটনায় জড়িত কাউকেই রেয়াত করা হবে না। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, ইন্দ্রজিৎকে তাঁর নাম-পরিচয় দেখে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। তাঁকে হাত-পা বেঁধে যেভাবে মারধর করে হত্যা করা হয়েছে, তা কোনওভাবেই সাধারণ গণপিটুনি হিসেবে দেখা যায় না।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, এই ঘটনার নেপথ্যে শুধুমাত্র জনরোষ নয়, বরং সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক উস্কানি কাজ করেছে। তাঁর কথায়, নির্বাচনে পরাজিত শক্তি এবং কিছু অতিবাম ও মৌলবাদী গোষ্ঠী পরিস্থিতিকে অশান্ত করার চেষ্টা করেছে। গোটা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি জানান, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে ইতিমধ্যেই মূল অভিযুক্তদের শনাক্ত করেছে পুলিশ। দিঘা ও বকখালি-সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত মোট ৩৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের পরিবারকে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দিতেও একাধিক পদক্ষেপ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারের হাতে ২৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইন্দ্রজিতের দাদা বাপি মণ্ডলকে সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরি দেওয়া হয়েছে। তাঁর কর্মস্থল হবে নবগঠিত সূর্যপুর পুলিশ ফাঁড়ি।
এছাড়াও দাঙ্গার সময় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ইন্দ্রজিৎদের বাড়ি সরকারি খরচে সংস্কার করা হয়েছে। পরিবারের বৃদ্ধ বাবার জন্য বার্ধক্যভাতা এবং মায়ের জন্য সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধাও নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।
প্রসঙ্গত, গত ৪ জুলাই বারুইপুর থেকে এক নাবালিকা নিখোঁজ হওয়ার পর ৫ জুলাই সকালে একটি পুকুর থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। অভিযোগ ওঠে, তাঁকে যৌন নির্যাতনের পর খুন করা হয়েছে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তদন্ত চলাকালীন প্রধান অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়।
নাবালিকার দেহ উদ্ধারের পর এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভের আবহে গুজব ও ভুল বোঝাবুঝির জেরে অটোচালক ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলকে অভিযুক্ত বলে সন্দেহ করে একদল উত্তেজিত মানুষ গণপিটুনি দেয়। পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। তদন্তে পুলিশ জানায়, ওই ঘটনায় ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের কোনও ভূমিকা ছিল না।
এদিন একই অনুষ্ঠানে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফুলতলায় ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত প্রসেনজিৎ বিশ্বাসের পরিবারকেও ১০ লক্ষ টাকার আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আইন নিজের পথে চলবে এবং কোনও নিরপরাধ মানুষের উপর আঘাত নেমে এলে সরকার সবসময় তাঁর পরিবারের পাশে থাকবে।
