June 26, 2026
রাজ্য

তারাতলা গুদাম বিপর্যয়: মৃত বেড়ে ১৫

স্থপতি ও নকশাকারকে কালো তালিকাভুক্ত করার ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

সংবাদ কলকাতা: কলকাতার তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদাম ভেঙে পড়ার ঘটনায় দায় নির্ধারণে আরও কড়া পদক্ষেপের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, এই প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে থাকা স্থপতি ও নকশাকারকে অবিলম্বে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে কলকাতায় নির্মাণ সংক্রান্ত ‘বেআইনি চক্র’ ভেঙে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এদিকে, এই দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫। এখনও ধ্বংসস্তূপে নিখোঁজের আশঙ্কায় জোরকদমে চলছে উদ্ধারকাজ।

কলকাতার ময়দানে পূর্ত দপ্তরের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি অনুমোদিত নির্মাণ প্রকল্পে স্থপতি, পরিকল্পনাকারী এবং নকশাকারদের নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব থাকে। কিন্তু তারাতলার গুদাম নির্মাণের ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব পালন করা হয়নি বলে অভিযোগ। তাই সংশ্লিষ্ট স্থপতি ও নকশাকারকে কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শনিবার সরকারি দপ্তর খোলার পর কলকাতা পুরসভার কমিশনার ও প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে এই প্রক্রিয়া শুরু করবেন বলে জানান তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, ভবিষ্যতেও কোনও স্থপতি, পরিকল্পনাকারী বা নকশাকার যদি তদারকির দায়িত্বে গাফিলতি করেন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য প্রশাসনিক নির্দেশিকা জারি করে বিষয়টি স্থায়ী নীতিতে পরিণত করা হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও দাবি করেন, কলকাতায় দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ সংক্রান্ত একটি বেআইনি চক্র সক্রিয় ছিল। এই ঘটনার তদন্তে যারাই জড়িত বলে প্রমাণিত হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনও ব্যক্তির পদমর্যাদা বা পরিচয় বিবেচনা করা হবে না বলেও তিনি জানান।

বুধবার তারাতলায় নির্মীয়মাণ একটি গুদামের লোহার বিম ও ঢেউখেলানো ধাতব পাতের উপর ঢালা কংক্রিটের অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরে গোটা কাঠামো ভেঙে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়েন বহু শ্রমিক। দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। মৃতদের মধ্যে তিন জন অপ্রাপ্তবয়স্ক নির্মাণ শ্রমিকও রয়েছেন বলে কলকাতা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। আহত অন্তত ১৯ জন এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁদের মধ্যে কয়েক জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

উদ্ধারকাজে কলকাতা পুলিশ, দমকল, কলকাতা পুরসভা, অসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে। ধ্বংসস্তূপে কেউ আটকে আছেন কি না তা জানতে গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার, অনুসন্ধানী কুকুর এবং বিশেষ প্রকৌশল যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। শুক্রবার পর্যন্তও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত ছিল।

পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় সেখানে ঠিক কতজন শ্রমিক কাজ করছিলেন, তার কোনও সরকারি নথি নেই। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ঘটনাস্থলে ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। সেই কারণেই ধ্বংসস্তূপে আরও কেউ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ছয় জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন নির্মাণকারী সংস্থার এক কর্তা, কাঠামো প্রকৌশলী, তদারককারী, শ্রমিক সরবরাহকারী এবং পুরসভার অনুমোদন সংক্রান্ত কাজে যুক্ত এক দালাল। পরে প্রাক্তন কলকাতা পুরসভার বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক কালিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও বিশেষ তদন্তকারী দল গ্রেপ্তার করে।

মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় দাবি করেন, এই নির্মাণ পরিকল্পনায় একাধিক প্রশাসনিক অনিয়ম ছিল এবং তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হবে। অতিরিক্ত মুখ্যসচিব রাজেশ পাণ্ডের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কলকাতা পুরসভা এলাকা এবং সংলগ্ন রাজারহাট, সোনারপুর, বারুইপুর ও মহেশতলায় চলা নির্মাণ প্রকল্পগুলির অনুমোদিত নকশা পুনরীক্ষণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার জেরে মৃতদের পরিবারকে রাজ্য সরকারের তরফে ১০ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মৃতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করেছেন।

এদিকে, এই ঘটনায় প্রাক্তন কলকাতা পুরসভার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজ্যের নগরোন্নয়ন ও পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক কুণাল ঘোষ পৃথকভাবে তাঁর জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন। যদিও ফিরহাদ হাকিম সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, ভবনের কারিগরি অনুমোদনের ক্ষেত্রে মেয়রের কোনও ভূমিকা থাকে না এবং তাঁকে এই ঘটনার জন্য দায়ী করা ঠিক নয়।

Related posts

Leave a Comment