কলকাতা — বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট নিয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার বিধানসভায় বাজেট পেশের পর সাংবাদিক বৈঠকে তিনি দাবি করেন, এই বাজেটে এমন কোনও ক্ষেত্র নেই যা উপেক্ষিত হয়েছে। এমনকি বিরোধীদেরও বাজেটের সমালোচনা করার বিশেষ সুযোগ নেই বলেই তাঁর মন্তব্য। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য সেবা, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কৃষি— এই পাঁচ স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে নতুন বাংলার ভিত্তি গড়ে তোলা।
বিধানসভায় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট পেশ করার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অর্থ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মণও। সেখানে শুভেন্দু বলেন, প্রযুক্তিগত অর্থে এটি পূর্ণাঙ্গ বারো মাসের বাজেট নয়। কারণ এই বাজেট কার্যকর হবে আগস্ট মাস থেকে আগামী মার্চ পর্যন্ত। তবে সময়সীমা কম হলেও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে কোনও ঘাটতি রাখা হয়নি বলে দাবি তাঁর।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই বাজেটে এমন কিছু নেই যা বাদ গিয়েছে। বিরোধীদেরও সমালোচনার বিশেষ সুযোগ নেই বলে আমার মনে হয়।’ তিনি আরও জানান, তৃণমূল বিধায়ক অশোক দেবও ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। শুভেন্দুর দাবি, অশোক দেবের একমাত্র আক্ষেপ ছিল আইনজীবীদের জন্য আলাদা কোনও ঘোষণা না থাকা। সেই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, অর্থমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনা করবেন এবং বাজেট বিতর্কের জবাবি ভাষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করা হতে পারে।
বর্তমান সরকারের বাজেটের মূল দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প এবং জনসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া গৌরব পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য। তাঁর বক্তব্য, নাগরিক নিরাপত্তা, মর্যাদা, ভয়মুক্ত পরিবেশ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করেই বাজেটের রূপরেখা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি আশাকর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, চুক্তিভিত্তিক কর্মী এবং সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকাকেও বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। রাজ্যের উন্নয়নে যাঁরা সরাসরি ভূমিকা পালন করেন, তাঁদের আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখেই একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন শুভেন্দু।
শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বড় বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, রাজ্যে শিল্পবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে আইনশৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী করা হবে। চাঁদাবাজি, তোলাবাজি এবং সিন্ডিকেট রাজের অবসান ঘটিয়ে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ ব্যবস্থার মাধ্যমে শিল্প স্থাপনের সমস্ত অনুমোদন দ্রুত দেওয়া হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করলে কোনও শিল্পগোষ্ঠীকে স্থানীয় পঞ্চায়েত বা প্রশাসনের কাছ থেকে আলাদা অনুমোদন নিতে হবে না। এতে বিনিয়োগকারীরা স্থানীয় স্তরের হয়রানি থেকে মুক্তি পাবেন বলে সরকারের আশা। পাশাপাশি পূর্ববর্তী সরকারের আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রণোদনা প্রকল্পও পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। এই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন রাস্তা, সেতু, রেল সংযোগ, বিমানবন্দর এবং সমুদ্র বন্দর গড়ে তোলার মাধ্যমে রাজ্যের পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
কৃষিক্ষেত্রেও একাধিক বড় ঘোষণা করা হয়েছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ২ টাকা করে ভর্তুকি দেওয়া হবে। এই প্রকল্পে রাজ্যের খরচ হবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি আলু এবং ধানচাষিদের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
যুব সমাজের জন্যও বড় বার্তা রয়েছে এই বাজেটে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী অক্টোবর মাস থেকে স্নাতক পাশ যুবক-যুবতীরা প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন। যাঁরা স্নাতক নন, তাঁদের জন্য মাসিক ২ হাজার টাকার সহায়তা দেওয়া হবে। তবে পরিবারের মাসিক আয় এক লক্ষ টাকা বা তার বেশি হলে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না। খুব শীঘ্রই এই প্রকল্পের বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হবে।
এদিকে বিরোধী শিবির অবশ্য বাজেট নিয়ে এখনই কড়া সমালোচনার পথে হাঁটতে নারাজ। তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ জানিয়েছেন, নতুন সরকারকে কিছুটা সময় দিতে চান তাঁরা। যদিও তাঁর দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে রাজ্যকে নিজস্ব সম্পদের উপর নির্ভর করে বাজেট তৈরি করতে হত। বর্তমান বাজেট অনেকটাই কেন্দ্রীয় সহায়তার উপর নির্ভরশীল।
প্রথম বাজেটেই একাধিক জনমুখী প্রকল্প, কর্মসংস্থান, শিল্প বিনিয়োগ এবং সামাজিক সুরক্ষার ঘোষণা করে বিজেপি সরকার আগামী দিনের প্রশাসনিক রূপরেখা স্পষ্ট করেছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। এখন নজর থাকবে ঘোষণাগুলির বাস্তবায়নের দিকে।
