কলকাতা, বুধবার :পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ক্রমশ বাড়ছে রাজনৈতিক টানাপোড়েন। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সই-বিতর্কের আবহে বুধবার ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনপত্র নিয়ে স্পিকার রথীন্দ্র বসুর দ্বারস্থ হলেন দলের বিক্ষুব্ধ বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এই পদক্ষেপ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে জোরালো হয়েছে তৃণমূলে সম্ভাব্য ভাঙনের জল্পনা।
বুধবার সকাল থেকেই বিধানসভা চত্বরে একে একে হাজির হতে শুরু করেন তৃণমূলের একাধিক বিধায়ক। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অরূপ রায়, শিউলি সাহা, আখরুজ্জামান, সন্দীপন সাহা, সাবিনা ইয়াসমিন, চন্দ্রনাথ সিংহ, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ আরও অনেকে। পরে কাউন্সিল চেম্বারে বৈঠকে বসেন বিদ্রোহী শিবিরের সদস্যরা। প্রায় দেড় ঘণ্টার বৈঠকের পর তাঁরা স্পিকারের কক্ষে গিয়ে সমর্থনপত্র জমা দেন।
সূত্রের খবর, ওই চিঠিতে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি উপদলনেতা হিসেবে জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা এবং শিউলি সাহার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মুখ্য সচেতক পদে প্রস্তাব করা হয়েছে আখরুজ্জামানের নাম। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বিদ্রোহী শিবিরের জমা দেওয়া চিঠিতে এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের সভানেত্রী হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
বিধানসভায় পৌঁছে সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, “আজ আমরা বিরোধী দলনেতা নির্বাচন নিয়ে বৈঠক করতে এসেছি।” অন্যদিকে চন্দ্রনাথ সিংহ স্পষ্ট ভাষায় জানান, “ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে আমরা মেনে নিয়েছি।” সন্দীপন সাহার দাবি, তৃণমূলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক তাঁদের পাশে রয়েছেন।
এই ঘটনার আগে মঙ্গলবার তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকারকে চিঠি দিয়ে বর্ষীয়ান বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদন করেছিলেন। তবে স্পিকার কলকাতার বাইরে থাকায় সেই চিঠি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়নি।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সই জালিয়াতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের অন্দরে অস্বস্তি বাড়ছিল। বিরোধী দলনেতা নির্বাচন সংক্রান্ত একটি চিঠিতে একাধিক বিধায়কের স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ, কয়েকটি স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। সেই অভিযোগ সামনে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। পরে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয় এবং সিআইডিও তদন্তে যুক্ত হয়।
সই-কাণ্ডের জেরে ঋতব্রত ও সন্দীপনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তাঁদের ঘিরে বিধায়কদের একটি বড় অংশ একত্রিত হতে শুরু করে। এরপর থেকেই তৃণমূলের ভিতরে নেতৃত্বের প্রশ্নে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই পরিস্থিতি আগামী দিনে বিরোধী শিবিরের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
স্পিকার রথীন্দ্র বসু বিদ্রোহী শিবিরের চিঠি গ্রহণ করলেও এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি। জানা গিয়েছে, চিঠিতে থাকা বিধায়কদের স্বাক্ষর যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই যাচাই সম্পূর্ণ হওয়ার পরই বিরোধী দলনেতা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হতে পারে।
এখন রাজ্য রাজনীতির নজর স্পিকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। বিরোধী দলনেতার আসনে শেষ পর্যন্ত কে বসবেন, আর তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়েই জল্পনা তুঙ্গে।
