28 C
Kolkata
October 21, 2026
রাজ্য

সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো ঠিক করতে দু’বছর, চোরবাগান-কাণ্ডে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে বিতর্ক

সংবাদ কলকাতা— পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হাসপাতালগুলিতে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে বলে স্বীকার করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, বেসরকারি হাসপাতালের সমতুল্য পরিষেবা সরকারি হাসপাতালে চালু করতে অন্তত দু’বছর সময় লাগবে। গত ১৭ অক্টোবর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনে পদপিষ্ট হয়ে জখমদের একাংশকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মঙ্গলবার এই মন্তব্য করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে স্বাস্থ্য পরিষেবার মান, সরকারি হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং বিপর্যয়ের সময় রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

চোরবাগানের পুজোমণ্ডপে হুড়োহুড়ির ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আহতদের প্রথমে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁদের মধ্যে ১৪ জনকে বাইপাসের ধারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে চিকিৎসক মহলের একাংশ প্রশ্ন তুলেছিলেন। কেন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হল, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

মঙ্গলবার নবমীর সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য ভবনের কন্ট্রোল রুমে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, আহতদের প্রাণ বাঁচানোই ছিল সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তাঁর বক্তব্য, সরকারি হাসপাতালে যে ধরনের পরিষেবা পাওয়া সম্ভব, তার তুলনায় উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা বেসরকারি হাসপাতালে থাকায় দ্রুত সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ১৯ জনের মৃত্যুর পর যাতে আর কোনও প্রাণহানি না ঘটে, সেটাই ছিল সরকারের উদ্দেশ্য। চিকিৎসা শুরু হওয়ার পর আর কারও মৃত্যু হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।


অ্যালার্জি পরীক্ষার জন্যও মুম্বই যেতে হয়, দাবি মুখ্যমন্ত্রীর

রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ঘাটতি তুলে ধরে শুভেন্দু বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরেও পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হাসপাতালে অ্যালার্জি পরীক্ষা করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সেই কারণে অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের মুম্বইয়ে যেতে হয় বলে দাবি করেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, সরকারি হাসপাতালের পরিষেবাকে বেসরকারি হাসপাতালের সমতুল্য করে তুলতে সময় লাগবে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে মাত্র ছ’মাস আগে। তাই গোটা ব্যবস্থার উন্নতি করতে অন্তত দু’বছর প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি।

চোরবাগানের ঘটনার পর কলকাতার বড় পুজোগুলিতে মেডিক্যাল টিম সক্রিয় রাখা হয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। পুজোর ছুটি বাতিল করে বহু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী জরুরি পরিষেবায় এগিয়ে এসেছেন। তাঁদের ভূমিকার প্রশংসা করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

নতুন সরকারের স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে প্রশ্ন দেবাশিসের

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা নিয়ে সরব হয়েছেন আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম মুখ দেবাশিস হালদার। তাঁর দাবি, সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোগত সমস্যা আগের সরকারের আমল থেকেই রয়েছে। তবে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রয়োজনীয় ওষুধের জোগান আরও কমেছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।



দেবাশিসের বক্তব্য, সাধারণ ওষুধও এখন সরকারি হাসপাতালে সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি স্বাস্থ্য দপ্তরকে জানানো হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের আমলে অন্তত সাধারণ ওষুধ পাওয়া যেত, কিন্তু নতুন সরকার আসার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

স্বাস্থ্য ভবনে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন দেবাশিস। তাঁর প্রশ্ন, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির জন্য দু’বছর সময় চাওয়া হলেও সেই সময়ের মধ্যে কী কী পদক্ষেপ করা হবে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা কোথায়? একই সঙ্গে পূর্বতন স্বাস্থ্য প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তবে তাঁর এই বক্তব্য ও অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারিতে স্থানান্তর নিয়ে নির্দেশিকার দাবি

অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের (এএইচএসডি) সম্পাদক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, চোরবাগানের ঘটনায় একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু যেমন নজিরবিহীন, তেমনই সরকারি হাসপাতাল থেকে এত সংখ্যক আহতকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের ঘটনাও অস্বাভাবিক।

উৎপলের বক্তব্য, আহতদের কোথায় চিকিৎসা করানো হবে, সেই বিষয়ে তাঁদের পরিবারের পছন্দ জানতে চাওয়া হয়েছিল বলে একটি ব্যাখ্যা পাওয়া গিয়েছিল। অন্য দিকে, জুনিয়র চিকিৎসকদের কাছ থেকে তাঁরা অভিযোগ পেয়েছেন যে, ইউনিট এবং বিভাগীয় প্রধানদের নির্দেশ মেনে আহতদের বাইপাসের ধারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। দু’জনকে এসএসকেএম হাসপাতালেও পাঠানো হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।

সরকার যদি মনে করে সরকারি হাসপাতালে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা করার মতো পর্যাপ্ত পরিকাঠামো নেই, তা হলে দ্রুত সেই ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন উৎপল। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে একই ধরনের বিপর্যয় ঘটলে কীভাবে আহতদের চিকিৎসা করা হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন।

কোন ধরনের রোগীকে সরকারি হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করা যাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে, তা নির্দিষ্ট করে একটি নির্দেশিকা জারির দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকলে ভবিষ্যতে রোগী স্থানান্তর নিয়ে চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের মধ্যে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া, বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো আহতদের মধ্যে অনেককেই পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উৎপল। তাঁদের কতজনকে সরকারি হাসপাতালেই চিকিৎসা করা সম্ভব ছিল, তা খতিয়ে দেখার পক্ষেও সওয়াল করেছেন তিনি।

শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব উন্নয়ন চাইছে চিকিৎসক সংগঠন

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর মেডিক্যাল সার্ভিস সেন্টারের সম্পাদক বিপ্লব চন্দ্রও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, অতীতেও সরকার পরিবর্তনের পর স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু প্রতিশ্রুতিতে কাজ হবে না, সাধারণ মানুষের স্বার্থে বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চান তাঁরা।

চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনা রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিপুল সংখ্যক আহতকে একসঙ্গে চিকিৎসা দেওয়ার মতো ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা কতটা এবং রোগী স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কী নিয়ম অনুসরণ করা হবে— এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন বলে মনে করছেন চিকিৎসক মহলের একাংশ।

মুখ্যমন্ত্রী দু’বছরের মধ্যে সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা উন্নত করার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন দেখার, সেই লক্ষ্যে সরকার কী পদক্ষেপ করে এবং হাসপাতালের ওষুধের জোগান, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা ও রোগী সামলানোর পরিকাঠামোয় কত দ্রুত পরিবর্তন আসে।

Related posts

Leave a Comment